নূপুরের মতো বেজেছি চরণে চরণে

ড. মীজানুর রহমান শেলী
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে রাজনীতি ও প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়ে দেশে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘাত-প্রতিঘাত সংকুল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রশাসনের ওপরেও বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করে। রাজনীতির টানাপোড়েন রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। রাষ্ট্রের জীবনে রাজনীতি সদা সক্রিয় এক প্রক্রিয়া। সরকার, সমাজ ও অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই এর অভিঘাত অমোঘ। সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত ব্যবস্থায় এই অভিঘাত ইতিবাচক। কিন্তু রাজনীতিতে বিভ্রান্তি ও বিকৃতি ঘটলে রাষ্ট্রের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন তেমনি প্রশাসনের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতির ত্র“টি ও দুর্বলতা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব বিস্তার করে। পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত রাজনীতি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯০-এর দশকের প্রথম থেকে দেশে সংসদীয় রাজনীতি পুনরুজ্জীবিত হলেও এর সঠিক রূপটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখলেও যাকে সুষ্ঠু দ্বিদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় তার পত্তন ঘটেনি। বেশ কিছু মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা এবং পররাষ্ট্রনীতির কোন কোন ক্ষেত্রে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে তফাৎ রয়েছে তা অনেক সময়েই দ্বন্দ্বময় রূপ নেয়। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও মর্যাদা নিয়েও এদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে যা প্রায়ই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এর ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র সুষ্ঠু পদচারণা করতে পারে না। তীব্র মতপার্থক্য এবং তার ফলে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংঘাত রাজনীতিকে অস্থির করে, গণতন্ত্রকে করে অনিশ্চিত। জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে না। রাজনীতি অস্থির হয়ে চলে যায় সংসদের আঙ্গিনার বাইরে, উত্তপ্ত ও সংঘাতময় হয়ে ওঠে রাজপথ।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি হয় টানাপোড়েনের। যেভাবেই হোক নির্বাচনে জয়লাভ করা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান এবং মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতাসীন থেকে কোন রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেÑ এ ভরসা বিরোধী দল রাখতে পারে না। এর ফলেই এ দেশের রাজনীতিবিদরা বস্তুত নিজেদের উপরেই অনাস্থার ব্যাপারে একমত হয়ে ১৯৯৬ থেকে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবর্তন করে। এ ধরনের দলনিরপেক্ষ সরকারের তদারকিতে যে নির্বাচন হয় তা দৃশ্যত অনিচ্ছা সত্ত্বে মেনে নিলেও পরাজিত পক্ষ একে সুষ্ঠু বলে স্বীকার করে না।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেখা দেয় আর এক নেতিবাচক প্রবণতা : বিজয়ী পক্ষ মনে করে যে তার জয় তাকে সবকিছুর মালিক-মোক্তারে পরিণত করেছে। নির্বাচন হয়ে দাঁড়ায় সব জেতা অথবা সব হারানোর এক প্রক্রিয়া। বিরোধী দলের সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ভূমিকা ও মর্যাদা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
অন্যদিকে সবকিছু জেতার খেলায় জয়ী হয়ে বিজয়ী দল অনেক সময়েই বাধা-বন্ধনহীন ক্ষমতার প্রয়োগে উৎসাহী হয়ে ওঠে। সংসদীয় গণতন্ত্রের আবরণে নির্বাহী শাখা প্রবল এক ভারসাম্যহীন সরকার ব্যবস্থায় বলদীপ্ত হয়।
আর এখানেই নিহিত থাকে প্রশাসনকে ক্ষমতার রাজনীতির আজ্ঞাবহে পরিণত করার চাবিকাঠি। প্রশাসন শুধু যে রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হয় তাই নয় একে দলীয় স্বার্থের অধীনস্থ মিত্র করার অগণতান্ত্রিক প্রয়াসও চলে। প্রশাসনের দলীয়করণের ফলে নিরপেক্ষ এবং পেশাগতভাবে দক্ষ প্রশাসনের উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্য দুর্বল ও ম্লান হয়ে পড়ে। প্রবল রাজনীতি ও ক্ষমতাসীন দলের বিপুল চাপে অনেক প্রশাসকই বিপথগামী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থে তারাও দলবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, কারণ সুশাসনই গণতন্ত্রের অন্যতম রক্ষাকবচ। সুশাসনের মাধ্যমেই রচিত হয় মানবাধিকার সংরক্ষণের ভিত্তি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সুষ্ঠু পরিবেশ। আর প্রশাসনযন্ত্র যদি দলীয়করণ ও অবাঞ্ছিত রাজনীতির ফলে বিকৃত ও দুর্বল হয় তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, জনকল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়নও দুষ্কর হয়ে ওঠে।
রাজনীতিকায়ন ও দলীয়করণ প্রশাসনের চরিত্র ভ্রষ্ট করে। যে ভূখণ্ডের সমন্বয়ে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে তার ইতিহাস এক বলিষ্ঠ ও পেশাগতভাবে উন্নত প্রশাসনের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। মহামতি অশোক, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, মৌর্য, তুর্কমেন আফগান ও মোগল সম্রাটদের আমলে এবং পরবর্তী ব্রিটিশ শাসনামলে এই উত্তরাধিকার রূপ পরিবর্তন সত্ত্বেও সমুন্নত থাকে। সারা উপমহাদেশে যেমন তেমনি বাংলায়ও রাজা গোপাল, শশাংক, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্, আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ ও নুসরত শাহের শাসনামলে এই সুশীল প্রশাসন রাষ্ট্র ও সরকারকে বলিষ্ঠ রাখে, সুশাসন সম্ভব করে এবং জনকল্যাণ আনয়নে ক্ষমতাসীন নেতাদের সাহায্য করে। ব্রিটিশ আমলে এবং ঔপনিবেশ-উত্তর যুগে প্রশাসনের এই রাজনীতিনিরপেক্ষ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত সত্তা মোটামুটি অবিকৃত থাকে। ১৯৭১-এর আগের পাকিস্তানে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ববাংলা) তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক অন্তর্লীন ঔপনিবেশবাদের শিকার হওয়ায় সুশাসনের ফল বাঙালির দুয়ারে পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোটি ইতিহাস-নির্দিষ্টভাবেই সুশাসনের অনুকূল ছিল। দুঃখের বিষয় এই, গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পর রাজনীতির দুর্বলতার কারণে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও পেশাগতভাবে দক্ষ উত্তরাধিকার ব্যাহত হয়েছে। ভ্রান্ত রাজনীতি ও দলীয়করণ মূলত সৎ ও নিরপেক্ষ এবং দক্ষ প্রশাসকদেরও দিশেহারা করে রেখেছে। সরকার যায়, সরকার আসে। এক দলের জায়গায় আসে আর এক দল। এই দল বদলের পালাক্রমের নেতিবাচক প্রভাব পরে দলীয়কৃত প্রশাসনের ওপর। ফলে যারা দলবদল মনের থেকে মেনে নিতে পারে না তাদের দুঃখ বুঝি সেই বহুচারিণী রমণীর মতো যে বলেÑ ‘মন দেয়া নেয়া অনেক করেছি
মরেছি হাজার মরণে
নূপুরের মত বেজেছি চরণে চরণে।’
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সনদে বলীয়ান এই যুগে প্রশাসনকে বহু-বল্লভার শৈলীতে চরণ থেকে চরণে স্থানান্তর করলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে, জনসাধারণের কল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়ন হবে অসম্ভব। সুতরাং যত শিগগির সম্ভব প্রশাসনকে দলীয়করণের মারাÍক রোগ থেকে মুক্ত করতে হবে। আর তা করতে পারলেই গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ জনগণের সার্বিক কল্যাণ অর্জনের পথ সুপ্রশস্ত হবে।
ড. মীজানূর রহমান শেলী :সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক মন্ত্রী