ধাবমানের গমন পথে

শিমূল ইউসুফ
আমার গলায় শিল্পের রজ্জুটা যাঁরা বেঁধে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে প্রধান যে কয়জন তারা হলেন আমার পিতামাতা, ভাই-বোন শহীদ আলতাফ মাহমুদ। আর ’৭১-এর পর সেই রজ্জুর দায়ভার নিলে তোমরা একগুচ্ছ মুক্তিযোদ্ধারা, যাঁরা ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা। রজ্জুর শেষ প্রান্তটা ছিল সেলিম আল দীন ও নাসির উদ্দীন ইউসুফের হাতে, যাঁরা ঢাকা থিয়েটারের প্রাণপুরুষ দিকনির্দেশনা দিয়েছে শিল্পের চারণভূমির ভিতরে কীভাবে হাঁটতে হবে। আজ যদি আমি নিজেকে প্রাণীপুত্র সোহরাব মনে করি তবে মানবপিতা সেলিম আল দীন তুমি কোথায় নাই নাই-নাই এরও শেষ আছে থাকে। কিন্তু আছের শেষে থাকে সেই নাই, দুই হাতে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নাই পিতা তুমি চলে যাওয়ার পর। সেই শূন্যতার ভেতর থেকে জন্ম নেয় আরেক শূন্যতা। ধাবমানের নির্দেশনার তাগিদ।
কখনো ভাবিনি পিতা নির্দেশনা দেব কিন্তু তোমাদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যরীতির চারণ ভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে এইটুকু তো বুঝতে শিখেছি যে আমাদের অহংকার করবার মতো আছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ঔপনিবেশিকতা থেকে কীভাবে নিজেদের বিযুক্ত করতে হবে সেই নির্দেশগুলোও কানে বেজেছে বারবার। তাই এই বিস্তারিত ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির চারণভূমি থেকে তুলে নিলাম মাদারপীরের গীত, পদ্মার নাচন, মহররমের জারী, নটপালা, লাঠি খেলা, কাছ নৃত্য।

২০০৭ সালের ১২ ডিসেম্বর পিতা তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলাম। কথা হয়েছিল অনেককিছু নিয়ে। কিছু কথা ছিল তোমার একান্ত ব্যক্তিগত, কিছু কথা নাট্য বিষয়ক। কিছু ছিল দিকনির্দেশনা। সেদিন বুঝিনি আমি যে, এই আমাদের শেষ দেখা। তুমি বলেছিলে বাচ্চু ধাবমান করবে। আর আমাকে বললে ‘ভাল করে খেয়ে স্বাস্থ্য ভাল কর তোকে তো সোহরাব করতে হবে।’ ‘কিন্তু সোহরাব করবার মত আমার তো প্রকাণ্ড শরীর নেই সেলিম ভাই’ আমি বললাম। হঠাৎ চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে গেলো তোমার, কি উজ্জ্বল মুখ যেন অকূলের কূলে তরী ভেড়াতে পেরেছ। সেই মুখটা আজো ভুলতে পারি না যে। বললে আমাদের কন্যা এশা আছে না এশা সোহরাব করবে। ওকে মানাবে ভাল।’ আড়াল থেকে তুমি কি দেখছো সেলিম ভাই যে- শিল্পী জীবনের সঙ্গে তোমার অন্ন-আহার বাঁধা ছিল সেখানে আমাদের কন্যা এশাও প্রবেশ করেছে।

ধাবমান নির্দেশনাকালে, আমি যতোই ধাবমানের গমন পথ অনুসরণ করেছি ততোবারই আমার মনে হয়েছে এ আমাদের কথা। এক সময় আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, মুনীন্দ্র মারাক সেতো তুমিই সেলিম ভাই, সম্মুখ বাস্তবতার কথা বলে আর বাচ্চু নহবত, আমি সুবতী।

এসাক এশা, সোহরাব অন্বিতা, আমার প্রাণীপুত্র সম্রাট আর শংকর। শংকর যাকে তুমি ডাকতে সোহরাব। আজ শংকরও নাই, সম্রাটও নাই, অন্বিতাও নাই। তুমিও নাই-এর দেশে চলে গেছ।

আর পারুল মৃতবৎসের প্রাণ প্রার্থনাকারী জননী। যে কিনা উষর যাত্রা জেনেও বুদ্ধের কুটির থেকে চলে যায় দূরের প্রান্তরে। জীবনের হিসাব যে এভাবে মিলে না তাও জানি সেলিম ভাই। তবুও মিলাতে চাই কখনো মিলে কখনো মিলে না।

হে ঈশ্বর তোমার কাছে খুব জানতে ইচ্ছা করে আর কয়টা দিন সেলিম ভাইকে বাঁচায়ে রাখলে তোমার তামাম দুনিয়ায় কী এমন ক্ষতি হতো? নিজেদের ক্ষর্বাকৃতির, বামন মনে হয়। আমাদের প্রার্থনার হাত এতোই ক্ষুদ্র ছিল যে সেলিম ভাইয়ের জীবন রক্ষার জন্য সেই হাত তোমার আরশের কাছে পৌঁছায়নি ঈশ্বর।

হে ঈশ্বর তোমার একান্ত অনুগত, ভক্ত যেজন সে সেলিম আল দীন যিনি স্বইচ্ছায় অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তোমার কাছে গেছে। অদেখাকে, দেখার আশায়, আত্মার শান্তির আশায়।

হে ঈশ্বর তুমি তার সঙ্গে জীবনের অন্য পাড়ে অবিশ্বাসী হইয়ো না। সেলিম ভাইয়ের জীবনের যে শূন্যতা আমরা পূরণ করতে পারিনি যেই বিশ্বাসের হাতগুলো এই জীবনে অবশেষে, সেলিম ভাইয়ের কাছে ঝিলিক ছুরি দেখা দিয়েছিল। সেই সকল কষ্ট যেন তাঁর লাঘব হয় হে ঈশ্বর।

সেলিম ভাই তোমার মৃত্যুশোককে পরাজিত করবো বলেই ধাবমান-এর নির্দেশনার কাজে হাত দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি তোমার মৃত্যুশোকের কাছে পরাজিত। পারি না, পারিনি, পারতে চাইও না। এই বুকের ভেতর প্রতিনিয়ত যে রক্তক্ষরণ তোমার অবর্তমানে তাকে রুখবো কেমন করে? প্রথমবারের মতো মঞ্চায়নের পর তোমার অনুপস্থিতি। তোমার সেই সলাজ হাসি, তোমার আশীর্বাদের হাত সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হলাম এ জন্মের মতো আমি ও এশাসহ ঢাকা থিয়েটারের সকল নাট্যকর্মী ও কলাকুশলী।

তবুও ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন। আমরা সবাই যেন সকল দুঃখ, কষ্ট, শোক, তাপ, মৃত্যু পারায়ে যাই সবল পায়ে।

[ad#co-1]