বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে অস্তিত্ব চেতনা ও বাস্তবতা

সা ই ফু জ্জা মা ন
বুদ্ধদেব বসু বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় স্বকীয় স্বভাবে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তার রচিত প্রব, গল্প, কবিতা ও উপন্যাসে গভীর জীবনবোধের উন্মেষ ঘটেছে। আত্মজৈবনিক রচনায় সমাজ ও সমকালের চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের পতন, অর্থনৈতিক ধস ও মানবাধিকার বিপন্ন সময়ে বুদ্ধদেব বসু সাহিত্য চর্চায় ব্রতী হন। বুদ্ধদেব বসু বিশেষভাবে উপন্যাসে মধ্যবিত্ত ও নাগরিক মনোজাগতিক বিষয়ক উপাদান, কৈশোরক স্মৃতির টানাপোড়েন শৈল্পিকভাবে উপস্খাপন করেছেন। বুদ্ধদেব বসু আত্মজৈবনিক কাহিনী উপন্যাসগুলো এমনভাবে বর্ণনা করেন যেখানে মধ্যবিত্তের চাওয়া-পাওয়া ও আকাáক্ষা প্রতিবিম্বিত হয়। দাম্পত্য সঙ্কট, পরকীয়া প্রেম তার উপন্যাসের প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে।
নর-নারীর অস্খির ভাবাবেগ, সমাজ ও সমকাল ঘিরে আবর্তন, পলায়ন প্রবৃত্তি ও আত্মসমর্পণ ঘিরে রহস্যময়তা তিনি গভীর মনোযোগের সাথে উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন। জীবনবোধ, নি:সঙ্গ চেতনা ও মানুষের সম্পর্কের বহুকৌণিক দিক উঠে এসেছে। তার আত্মজৈবনিক রচনা যেসব মানুষ, জনপদকে তুলে ধরে সেখানে আমাদের পরিচিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে আমরা খুঁজে পাই। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্খায় ব্যক্তি মানুষের শোষণ, যন্ত্রণা ও নি:শেষ হওয়ার অভিজ্ঞতা বিবৃত হয়। জীবনযুদ্ধে অবতরণ, পলায়ন, মানস প্রবণতা ও একাকিত্ব উপভোগের আয়োজন বুদ্ধদেব বসু অন্তরঙ্গভাবে তুলে আনেন। দাম্পত্য জীবন বিন্যাস সঙ্কট ও বহুমাত্রিক বাকপরিবর্তন তার উপন্যাসের মৌল উপাদান। মধ্যবিত্তের সংশয়, অবিশ্বাস ও নতুন উৎসে তার যুক্ত হওয়াকে বুদ্ধদেব বসু শিল্পরূপ দিয়েছেন। উপন্যাসে বিধৃত চরিত্র অপরাধে ভোগে। তাদের মনের গভীরে দহন যাতনা তীব্র হয়।
বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস সাড়া, নির্জন সাক্ষর, শেষপাণ্ডুলিপি, পাতাল থেকে আলাপ, রাতভরে বৃষ্টি, গোলাপ কেন কালোতে অস্তিত্বচেতনা, প্রেম ও সামাজিক রূপান্তর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বুদ্ধদেব বসুর প্রথম উপন্যাস ‘সাড়া’ মানবিক অতৃপ্তি ও যন্ত্রণার উৎসসানী। নায়ক সাগর স্বপ্ন বিহারী কবি। রোমান্টিক কল্পলোকের সে বাসিন্দা। শৈশব থেকেই সে কল্পবিলাসী। মায়ের স্নেহচ্ছায়ায় তার বেড়ে ওঠা। বাবার তত্ত্বাবধানে পারিবারিক গ্রন্থাগারে তার পাঠচর্চা শুরু হয়। এখানেই তার সাহিত্য সাধনার শুরু।
প্রবেশিকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সে কোলকাতায় যায়। হোস্টেল রুমমেট সত্যবান মিত্রের সূত্রে তার পত্রলেখার সাথে তার পরিচয়। বিয়ের ব্যাপারে পত্র লেখার অধিক উৎসাহে তার প্রণয় ভঙ্গ ঘটে। মানবিক সঙ্কটে নিপতিত সাগর বিএ পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে ঢাকায় বাবার আশ্রয়ে ফিরে আসে। বাবার পছন্দ করা মেয়ে মনি মালাকে সে বিয়ে করে। কর্মহীন সাগর পিতার পেনশনভোগী আশ্রয়ে সে নিরাপদ বোধ করে না। মনি মালার মাপা ভালোবাসায় সে কাতর হয়ে ওঠে। তার কবি হৃদয়ের দোলায়িত অবস্খা ও বু বিনোদের পরামর্শে সে পুনরায় কোলকাতায় গমন করে। অফিসে সাত/আট ঘন্টা কর্মক্লান্তি ও সাহিত্য সাধনায় সে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড উৎসাহে এ কাজে সে সৃষ্টি মুখর সময় কাটায়। নির্মলাকে সঙ্গী করে হাঁটতে গিয়ে শৈশবের বাবী লক্ষ্মীর সাথে তার দেখা হয়। লক্ষ্মী ও সাগরের গভীর সম্পর্ক নতুন দিয়ে বাঁক নেয়ার আগে কাহিনী বিস্তৃত হয়। সে কোলকাতা থেকে চলে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেয়। লক্ষ্মীপ্রেমে পড়ে সাগর ভেদ বুদ্ধি হারায়। ছায়ামূর্তিকে সে লক্ষ্মী ভেবে কাছাকাছি জড়িয়ে ধরতে গিয়ে সাগরের মৃত্যু হয়।
কল্পনাবিলাস সাগরের সঙ্গী। তার মাতৃ নির্ভরতা তাকে পরাশ্রয়ী মানুষে রূপান্তর করে। দাম্পত্য বিচ্ছেদ ও একাকিত্ব তাকে কল্পলোকের বিশেষ স্তরে তাকে নিয়ে গিয়েছে। ‘সাড়া’ এক মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন আশ্রয়ী উপন্যাস। আর্থ-সামাজিক মনোবৈকল্য কাহিনীর সুতোয় বাঁধা পড়েছে উনিশশতকী এক সমাজ ও রাষ্ট্র সংগঠনের বহুতল দিক।
উদ্ধৃত করা যেতে পারে স্বপ্ন জগতে বিচরণকারী সাগরের ব্যর্থতার চিত্র।
‘পাহাড়ের খাড়াগায়ের উপর বুক রাখিয়া দুটি হাতের উপর শরীরের সমস্তভার ছাড়িয়া একটু একটু করিয়া সে কাৎরাইতে কাৎরাইতে উপরে উঠিত লাগিল। …
চূড়ার কাছাকাছি যখন আসিল, তখন শরীরের গাঁটগুলিতে কে যেন চিবাইয়া খাইতেছে। তবু সে একবার শেষ চেষ্টা করিল : দুই হাত ভর দিয়া গলা বাড়াইয়া চূড়ার উপর একবার তাকাইল। ঐ তো … অতি অস্পষ্টভাবে সে একটি মূর্তি দেখিতে পাইল আকাশের রৌদ্র দিয়া রচিত তাহার স্বচ্ছ শুভ্র প্রতিমাটিকে ফিরিয়া কঠিন নীহারের অবগুণ্ঠন টানিয়া দেওয়া হইয়াছে। সে যেই মূর্তিটিকে একটু ভালো করিয়া দেখিতে যাইবে অমান হাত পিছলাইয়া বিপুলবেগে নিচের দিকে নামিতে লাগিল। (বুদ্ধদেব বসুর রচনা সংগ্রহ ১ পৃ.৭৯)
কল্পনাজগতে নায়কের অবস্খান, সংবেদন অনুভূতি, বিচ্ছেদ বেদনা কোলকাতা নগরের বিপরীত পরিবেশ ও মায়ের মৃত্যুজনিত বেদনাবোধ এখানে স্পষ্ট। বুদ্ধদেব বসুর যবনিকা পতন উপন্যাসে নগর জীবনের বহুমাত্রিক ভাঙাগড়া ও পরিবর্তন ধরা পড়েছে। মৃগাঙ্ক শেখর ও অমিয় সরকার দুই বুর চরিত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র জীবনধারা এ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্খায় নিয়োজিত শ্রমজীবী ও মালিক পক্ষের অবস্খান, জীবনযাপন ও দ্বন্দ্ব মুখরতার কাহিনী স্পষ্ট। দুই বু অঞ্জলী বসুর প্রতি আকর্ষিত। ঈর্ষায় দগ্ধ দুই পুরুষ, নগর জীবনের কলরোল, ব্যক্তির জাগরণ ও অবদমন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মৃগাঙ্ক সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত। এক সময় সাহিত্য চর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নি:সঙ্গ হয়ে পড়ে। আর্থিক কষ্ট, আনন্দহীন জীবনযাপন সঙ্গী করে প্রকাশনা সংক্রান্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তার জীবিকা নির্বাহ হয়। সমাজ ও প্রতিবেশের প্রতি তার ব্যঙ্গ দৃষ্টি। অঞ্জলীকে লেখা তার চিঠিতে একজন মানুষের বিচ্ছিন্ন চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটে। পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন মৃগাঙ্ক প্রাণান্ত পরিশ্রম করে। বু অমিয়কে ভোগবাদী জীবন থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। অমিয় মূল্যবোধহীন মানুষের প্রতিনিধি। যৌন ব্যভিচারে অভ্যস্ত সে। মাতাল সে। ইলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে প্রত্যাখ্যাত হয়। বিপরীত মেরুর মানুষদের বুদ্ধদেব বসু একসঙ্গে করেছেন এ উপন্যাসে। অঞ্জলী ইনকাম ট্যাক্স অফিসের এক কেরানীর মেয়ে। বুদ্ধদেব বসু অঞ্জলী সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, অঞ্জলী জাতে উঠেছে বটে। তাদের পজিশন ঠিক কোথায় বুঝতে পারে না। উভয় সমাজের মাঝামাঝি তারা ঝুলছে।
মৃগাঙ্ক লেখা অঞ্জলীর চিঠিতে তার মানসিক গড়ন বোঝা যায়। এ চিঠি যেন তার এক দার্শনিক বাস্তববোধের প্রতিফলন। চিঠিতে লেখা ছিল তোমার সঙ্গে আমার আলাপ হয় তা ঠিক। কিন্তু বেশি দিনের আলাপ হলেই কি সব জেনে ফেলতাম একেবারে নির্ভুল, নি:সন্দেহে? বছরের পর বছর সাহচার্য কাটিয়ে মানুষ পরস্পরের অপরিচিত থেকে যায়, তা কি জানো না। যবনিকা পতন উপন্যাসে প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি অপ্রধান চরিত্রের অভিব্যক্ত ও তাদের জীবন প্রবাহ সমাজমনস্ক ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর চার দশক পর্যন্ত কোলকাতার সমাজ জীবনে মধ্যবিত্তের অন্ত:সারশূন্য আভিজাত্যের প্রলেপ দৃশ্যমান হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অস্তিত্ব সংগ্রাম নির্ভর করে বুদ্ধদেব বসু রচনা করেছেন ‘রডোডেন ড্রন গুচ্ছ উপন্যাস। কোলকাতার মেয়ে সুমিত্রা এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এক মেয়ে স্কুলে শিক্ষকতায় সে নিয়োজিত। স্কুলের গতানুগতিক পরিবেশে দুমাসের মধ্যে সে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মায়ের মৃত্যুজনিত কারণে সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশার মানসিক অবস্খা তারা তৈরি হয়নি। উদ্ধৃত করা যেতে পারে :
‘ভাগ্যিস তার মা নেই। কখনো ছিলো বলেও সে মনে করতে পারে না। শিশুকালে মার মৃত্যু হওয়াতে তার একটা সুবিধে-হ্যাঁ সুবিধে বইকি হয়েছে তার বাবার কাছ থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এত দূরে সরে এসেছে যে গেলো দশ বছরের মধ্যে তাকে সে একবার চোখে দ্যাখেনি। দ্বিতীয় পরিবার- এখন পর্যন্ত তার সংখ্যা বেড়েই চলেছে­ নিজে বিজড়িত, ব্যতিব্যস্ত উদভ্রান্ত ভদ্রলোকের সুমিত্রার প্রতি কোন মন দেয়ার সায় ওঠে না।
[বুদ্ধদেব বসুর রচনা সংগ্রহ ২য় পৃ: ৩১১-৩১২]
দাদা মশাইয়ের সঙ্গে যৌবনের তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। আর্থিক লেনদেনের ক্ষীণ সম্পর্কটুকু শুধু বজায় থাকলো পদ্মার উতরোল মফস্বল নারায়ণগঞ্জের জীবন প্রবাহে সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েও হারিয়ে ফেলে। বুদ্ধদেব বসু বিভিন্ন পর্যায়ে সুমিত্রার মানসিক অবস্খা বর্ণনা করেছেন চন্দ্রিকা উপন্যাসের অন্য এক চরিত্র। নটরাজের সাথে তার জৈবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে লেখালেখি করে। চন্দ্রিকা তার সৃষ্টি নায়িকা সুরমার মাঝ দিয়ে তার মনোভাবের প্রকাশ ঘটায়। সাধারণ মানুষদের থেকে সে দূরত্বে থাকে। এ উপন্যাসে নগর জীবনের মূল্যবোধহীন মানুষ ও সামাজিক সম্পর্ক প্রাধান্য পায়।
দুটি বিশ্বযুদ্ধ, সামাজিক সংগঠন, মানবিকতা ও সম্প্রীতি বিনষ্টের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এ উপন্যাসে প্রতিপাদ্য হয়েছে। ‘নির্জন স্বাক্ষর’ উপন্যাসের নায়ক সোমেন দত্ত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে অসহায় হয়ে পড়ে। জীবিকা ও অস্তিত্ব বজায় রাখতে মানুষের নিরন্তর ছুটে চলা সোমেন দত্ত প্রত্যক্ষ করেন। অন্য নারী মালতী সেনের প্রতি তার আকর্ষণ তাকে দাম্পত্য জীবন থেকে মুক্ত করে। সে উত্তাপহীন সম্পর্ক রক্ষা করে মীরার সাথে। স্ত্রীর শরীর, চেহারা তার অচেনা লাগে। স্ত্রী ও স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ফিকে হয়ে যায়। মালতীকে অর্থ যোগানের তাড়নাও স্ত্রীর আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টি তাকে পর্যুদস্ত করে। দহন যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে আত্মহত্যা করে।
বুদ্ধদেব বসুর আরেক উপন্যাস ‘যেদিন ফুটলো কমল’। আধুনিক সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। আধুনিক মানুষ তার নৈ:সঙ্গ চেতনা আকাáক্ষা, মুক্তি­ এ বিষয়সমূহ এখানে মুখ্য প্রতিপাদ্য হয়েছে। পার্থ প্রতীম এ উপন্যাসের নায়ক রোমান্টিক ভাবনায় নিপতিত সঙ্গীহীন এক পুরুষ। পার্থ প্রতীম এ সমাজের হাজারো মানুষের একজন প্রতিনিধি। সে তার কর্মের মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়। সে লেখালেখি করে। বুদের উদ্দেশ্যে সে বলে : লেখাটা ভালো হয়েছে। কি মন্দ হয়েছে তাতে কিছু এসে যায় না, কিছু একটা হয়ে উঠতে পেরেছে, সেটাই আসল কথা। হয়তো একদিন ও আমাকে বলেছিলো ‘এই লেখার ভিতর দিয়ে আমি হয়ে উঠছি। আমি জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়ে উঠছো? ‘কী আবার/- আমি হয়ে উঠছি (বুদ্ধদেব বসুর রচনা সংগ্রহ : ৩ পৃ. ১৭১)। উত্তম পুরুষে বর্ণনা কাহিনী মধ্যবিত্তে আশা-আকাáক্ষা স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় আবর্তিত। পার্থপ্রতীমের নি:সঙ্গতা বড়ো হয়ে উঠেছে। একজন লেখকের অতৃপ্তি, গন্তব্য অন্বেষ ও হতাশা এ উপন্যাসে ছুঁয়ে আছে। লেখকের নির্জন উপভোগী মানসিকতা, আত্মসম্মান ও অসহায়ত্ব ঘিরে আছে। পার্থপ্রতীম শ্রীলতার প্রেম প্রত্যাখ্যান করতে অধিক উৎসাহী হয়ে ওঠে। প্রেমের স্পর্শে পার্থপ্রতীমের চেতনার দশদিক রঙিন হয়ে ওঠে। নি:সঙ্গতা থেকে মুক্তি পাওয়ার বিহ্বলতায় রোমাঞ্চিত।
বুদ্ধদেব বসু তার উপন্যাসে সমাজ, মধ্যবিত্ত শ্রেণী, মধ্যবিত্তের হাহাকার ও নগর জীবনের দোলাচাল অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা সরল জীবনযাপন করেনি। এদের বার বার অধিকার করেছে জটিল মনস্তত্ত্ব ও যান্ত্রিকতা। বিরহ ও মুক্তির পথে তারা হেঁটেছে। অনেক দূর অতিক্রম করে তারা বুঝতে পেরেছে মানুষের মুক্তি বলে কিছু নেই। মানুষ শৃঙ্খলিত। জটিল জীবন চক্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্খা মানুষের সুকুমার বৃত্তি বিকাশের অন্তরায়। ‘রাত ভরে বৃষ্টি’ বুদ্ধদেব বসুর রোমান্টিক মানসধারার উপন্যাস প্রেমের প্রকাশ ও ট্রাজেডি মূল প্রতিপাদ্য বিষয় এ উপন্যাসে। দাম্পত্য জীবনের প্রেম, সমাজ ভাবনা ও দ্বন্দ্ব আধুনিক মানুষের সঙ্গী। নয়নাংশু নিজের উদ্দেশ্যে বলে : কিন্তু তুমি পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। তুমিই বা কি রকম প্রেমিক আর স্বামী ছিলে জিজ্ঞেস করি। আজতো দেখছো যে প্রেম নিয়ে চৌদ্দ বয়স থেকে এতো কথা ভেবেছো আর বলেছো তার সত্যিকারের চেহারা কী­ ঐ জয়ন্ত স্খূল অশিক্ষিত বেপরোয়া তার জন্যে আজ খুলে গেল টিৎসিয়ানোর কোন ছাত্রের আঁকাপক্ব যুবতী শ্যামাঙ্গী এক ভেনাসের শরীর। আর তুমি শুশে শুয়ে ভাবছো শুধু ভাবছো যেমন ভেবেছো জীবন ভরে।
বড্ড বেশি ভেবে ভেবে তুমি অক্ষম হয়ে গিয়েছো নয়নাংশু। তা না হলে এতদিনে অপর্ণার দিকে আর বেশি মনোযোগ দিতে না (রাত ভরে বৃষ্টি পৃ. ৩১-৩২)
দাম্পত্য সঙ্কট ও নৈ:সঙ্গা চেতনা বুদ্ধদেব বসুর অধিকাংশ উপন্যাসে মুখ্যপ্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে। আত্মআবিষ্কার ও আত্মস্বীকার দুইয়ের মাঝে স্বপ্ন জগতের প্রবেশ চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। নয়নাংশু ও মালতীর অন্তহীন নি:সঙ্গতা ও বাস্তবতা খুঁজে পেয়েছেন বুদ্ধদেব বসু।
নতুনবোধের সংক্রমণ ও বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে বুদ্ধদেব বসু যে উপন্যাস রচনা করেছেন তার কাহিনী বিস্তৃতি ও কাব্যিক ভাষায় বর্ণনায় যে জীবনযাপন করতে পারে না মানুষ সেই দিকে স্বপ্নলোকে যাত্রা করে। বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বাস্তবতার বহুকৌনিক অবস্খান দৃঢ়। বুদ্ধদেব বসু সচেতনভাবে বিচার বিশ্লেষণ ও কাহিনীর ধারাবাহিকতায় আশ্বস্ত করে অনুভবের সুতো বুনেছেন। তার উপন্যাস মধ্যবিত্ত মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি।
সহায়ক গ্রন্থ
বিশ্বজিৎ ঘোষ : বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে নৈ:সঙ্গ চেতনার রূপায়ণ বাংলা একাডেমী ১৯৯৭
শঙ্খ ঘোষ : ঐতিহ্যের বিস্তার : কোলকাতা প্যাপিরাস ১৯৮৯
উত্তরাধিকার : বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা : বাংলা একাডেমী ১৯৭৪।