বিক্রমপুরের পুরাকীর্তি : মা ই জ পা ড়া র ম ঠ

ঢাকা থেকে বিক্রমপুরের দিকে নৌপথে অথবা সড়কপথে ঢুকতে গেলে পশ্চিম পাশে দু’টি সুউচ্চ মঠ চোখে পড়ে। সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ৬০-৭০-এর দশকে লঞ্চে শ্রীনগরের দিকে যাওয়ার পথে একটু তাকালেই মঠ দু’টি সহসাই দৃশ্যমান হয়ে উঠত। এর একটি শ্যামসিদ্দির মঠ, অপরটি মাইজপাড়ার মঠ। মৃত্যুর পর চিতার স্থানকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার জন্য অতীতে এ ধরনের মঠ নির্মিত হয়েছিল।
দেওয়ান মুর্শিদ কুলী খান বাংলা ১২১৯ সালে জমিদারি প্রথা চালু করেন, তখন বিক্রমপুরকে আটটি তালুকে (পরগনা) বিভক্ত করে আটজনকে জমিদারির দায়িত্ব প্রদান করেন। আটটি তালুক হল ভাগ্যকুল, শ্রীনগর, মাইজপাড়া, সিংপাড়া, তালতলা, সিরাজদিখান, লৌহজঙ্গ ও বালিগাঁও। এর মধ্যে মাইজপাড়া পরগনার (তালুক) দায়িত্ব গ্রহণ করেন গোবিন্দ প্রসাদ রায়। গোবিন্দ প্রসাদ রায়ের মৃত্যু হলে তার ছেলে তারা প্রসাদ রায় ও বৈদ্যনাথ রায় জমিদারির হাল ধরেন। তাদের দু’জনের প্রচেষ্টায় মাইজপাড়া বাজারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা জনকল্যাণে বাজারে একটি পোস্ট অফিস স্থাপনসহ একটি বড় খেলার মাঠ তৈরি করেন। মাইজপাড়ার খেলার মাঠটি এখনও বিক্রমপুরের মধ্যে বৃহত্তম। এছাড়া মাইজপাড়া বাজার থেকে এলাকার লোকজনের সুবিধার কথা চিন্তা করে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গয়না নৌকার সার্ভিস তারাই প্রচলন করেছিলেন। জমিদার তারা প্রসাদ রায়ের প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান থাকা অবস্থায় ব্রজ বিহারি রায় নামে এক পালক পুত্র গ্রহণ করেন। গীরেন্দ্র ডাক্তার ও নসু ডাক্তার ব্রজ বিহারি রায়ের নাতি অর্থাৎ ব্রজ বিহারি রায়ের পুত্র দীগেন্দ্র রায়ের সন্তান।
অপরদিকে তারা প্রসাদ রায়ের পরবর্তী বংশধররা হচ্ছেন যথাক্রমে পূর্ণচন্দ্র রায়, বিলাস চন্দ্র রায় ও অজিত চন্দ্র রায়। বর্তমানে ওই বাড়িতে বসবাসরত সুজিত রায় ও শংকর চন্দ্র রায় তারা প্রসাদ রায়ের আসল উত্তরাধিকারী। সাতটি ফটকবিশিষ্ট জমিদারবাড়িটি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তেএসে দাঁড়িয়েছে। অযতœ আর অবহেলায় মূল বাড়ির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। জমিদার তারা প্রসাদ রায় মৃত্যুবরণ করলে তার চিতাস্থলে প্রায় ১৫০ বছর আগে ১২০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মাইজপাড়ার মঠটি তৈরি করা হয়। দু’পাশে তার দুই সহধর্মিণী যথাক্রমেÑ সুধামণি দেবী ও নবদুর্গা দেবী মৃত্যুবরণ করলে সেখানেও দু’টি ছোট আকৃতির মঠ তৈরি করা হয়।
মাইজপাড়া বাজারের একটু দক্ষিণে মুখার্জি বাড়িতে অনুরূপ উচ্চতার একটি মঠ একই সময় নির্মিত হয়েছিল। ১২৩ বছর আগে বাংলা ১২৯২ সালের ৩১ আষাঢ় মঙ্গলবার সকাল ৮টায় ভূমিকম্পে তারা প্রসাদ রায়ের চিতাভস্মের ওপর নির্মিত মঠটিসহ মুখার্জি বাড়ির মঠটি ভেঙে যায়। পাশাপাশি দু’টি মঠ ভেঙে গেলেও তারা প্রসাদ রায়ের মঠটি এক বছর পর বাংলা ১২৯৩ সালের বৈশাখ মাসে পুনর্নির্মিত হয়। মঠের গায়ে লিখিত হরফ থেকে বোঝা যায়Ñ এটি তৈরি করেছিলেন রাজনারায়ণ নামে একজন নির্মাণ কারিগর।
মঠের নির্মাণশৈলী অত্যন্তচমৎকার, সব কিছুই কারুকার্যময়। মঠের খোপগুলোতে প্রচুর টিয়াপাখি বসবাস করে। মঠের চূড়ায় পরপর দু’টি তামার তৈরি কলস আছে। অনেকের ধারণা, কলসিতে রতœসামগ্রী থাকতে পারে। সে কারণে পরপর দু’বার চূড়ার কলসটি ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। প্রথমবার ১৯৭১ সালের বিজয় দিবসের দু’তিনদিন পর কতিপয় অস্ত্রধারী (তখনও অস্ত্র জমা হয়নি) কলস লক্ষ্য করে প্রচুর গুলিবর্ষণ করে, যাতে নিচের অংশ ভেঙে কলসটি পড়ে যায়। কিন্তু লৌহদণ্ড শক্ত থাকায় কোনভাবেই কলসটি তারা ফেলতে পারেনি। দ্বিতীয়বার ২০০৮ সালের মার্চে রাতের অন্ধকারে বাঁশ ফেলে উপরে উঠে নিচ থেকে দড়ি বেঁধে টেনে কলস দু’টি নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। ছিঁড়ে যাওয়া দড়ির অংশটি এখনও ঝুলে আছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে মাইজপাড়ার মঠটি সংরক্ষণ প্রয়োজন।
আবদুর রশীদ খান