সূর্যদীঘল বাড়ী উপন্যাসের পটভূমি এবং আবু ইসহাক

তিতাশ চৌধুরী
উপন্যাসটি প্রকাশের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় লেখক ভীষণ মনোকষ্টে ভোগেন। এর মধ্যে গোলাম মোস্তফা সম্পাদিত ‘নওবাহার’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ১৯৫১-৫২ সালে এটি প্রকাশিত হয়। তখনো উপন্যাসটি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে এটি ১৯৫৫ সালে কলকাতা থেকে পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় এর আলোচনা বের হয়। ফলে এটি সহজেই সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং নানা মহলে এটি আলোড়ন সৃষ্টি করে।

লোকসংস্কার আর সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেই ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ উপন্যাসের সূত্রপাত। গ্রামে সাধারণত দক্ষিণমুখী ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়, কিন্তু সূর্যদীঘল বাড়ী ছিল পূর্ব-পশ্চিমমুখী। যেমন কথা বলে:

‘দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা
পুব দুয়ারী তাহার প্রজা
উত্তর দুয়ারীর খাজনা নাই
পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই।’

সেজন্যই ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ জনজীবনের অন্যরকম রূপ পেয়েছিল। সংস্কার আর কুসংস্কারে আচ্ছাদিত ছিল বাড়িটি। এই ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ উপন্যাস লিখেই আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩) রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ এবং মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ’ কবিতা ও কাব্যের মতো। জীবনের বাস্তবতা ও সমাজের নিরঙ্কুশ সত্য প্রকাশে আবু ইসহাক সদা তৎপর ছিলেন। ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ ওই বিশেষ ভাবসত্যের পরিচয়ই বহন করেছে। এ উপন্যাসে বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের মানুষের সমাজ ও জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছে।

এই উপন্যাসের পটভূমি মূলত গ্রাম হলেও লেখক শহরে বসেই এর কাহিনী, চরিত্র ও পারিপার্শ্বিকতা নির্মাণ করেন। লেখকের নিজের কথায় : “১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি নারায়ণগঞ্জেই ছিলাম। তখন ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’র প্লট আমার মধ্যে শাখা বিস্তার করতে শুরু করেছে। এক শয্যাবিশিষ্ট দুই কামরার একটায় থাকেন পুরনো সহকর্মী ফজলুল করিম। আমি যে কিছু লেখালেখি করি তা তিনি জানতেন। তাকে বললাম, ‘ভাই, আপনার রুমটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আপনি যদি আমার জায়গায় আসেন তাহলে আমার লেখালেখির কাজটা চলতে পারে’।… ফজলুল করিমের উদারতায় আমি সেই আশ্রয় পেয়েছিলাম। সেখানে দরজা বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে লেখালেখির সুযোগ আমি পেয়েছি। সেই নিভৃত কক্ষেই আমি ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ লেখা শুরু করি। উপন্যাসটির অর্ধেকটা ওখানে বসেই লেখা।… এর প্লট তিনি ট্রেনে আসা-যাওয়ার সময় সাধারণ মানুষের জীবন থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আমি বদলি হয়ে যাই পাবনা। সেখানে কিছুদিন এক মেসে থেকে বুঝতে পারলাম হট্টগোলের মধ্যে লেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ঠিক সেই সময়ে পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক প্রখ্যাত সপ্ততীর্থ প-িতের সপ্ততীর্থকুটির ভাড়া দেয়া হবে শুনে একাই সে দোতলা বাড়িটা নিলাম মাসিক পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায়। সেই বাড়ির নিভৃতে নির্জনে দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ লেখা শেষ করি” (অপরিশোধ্য ঋণ/স্মৃতি বিচিত্রা, পৃ-২৩-২৪)।

উপন্যাস লেখাই বড় কথা নয়। এর প্রকাশনাও আরেকটি দিক। তিনি এর জন্য কোনো প্রকাশক জোগাড় করতে পারেননি। তার নিজের কথায়: ‘ঢাকা ও কলকাতার অনেক প্রকাশকের দ্বারে ধরনা দিয়েও উপন্যাসটি প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পারিনি।’ একদিন ঘটনাচক্রে কবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ। তখনকার সময়ে তেজগাঁও থানার দাঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কিত ও কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার এক ফাঁকে লেখক সঙ্কোচের সঙ্গে কবিকে বললেন, ‘আমার কিছু গল্প সওগাত, আজান ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে।’

জসীম উদ্দীন বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাই! তাই তো আপনার বক্তৃতার ভাষা এতো সুন্দর। পুলিশের লোক সাহিত্য সাধনা করে, এ তো ভাবাই যায় না’।…

‘আমি একটা উপন্যাস লিখছি। কিন্তু প্রকাশক পাচ্ছি না।’ কুণ্ঠার সঙ্গে বললাম আমি।

আমার কথা শুনে তিনি কিছুটা অবাক হলেন। তবে তেমন গুরুত্ব দিলেন বলে মনে হলো না। বললেন, ‘লিখতে থাকুন, লিখতে লিখতে হাত পাকা হবে। লেখা ভালো হলে অবশ্যই প্রকাশক পাবেন।’

‘আমি কি একদিন পা-ুলিপি নিয়ে আপনার বাসায় যাবো? আপনি একটু দেখবেন?’

‘তা আসুন একদিন। যখন আসবেন রবিবার ছুটির দিন নয়টা-দশটার দিকে আসবেন।’

নানা কাজের ঝামেলায় কবি সাহেবের বাসায় আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। অবশেষে এক রবিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তখনকার ফুলবাড়িয়া স্টেশনের কাছে কবির বাসা ‘ফুলবাড়ি’ গিয়ে হাজির হলাম ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’র পা-ুলিপি নিয়ে। পা-ুলিপি হাতে দিতেই তিনি বললেন, আমি তো খুব ব্যস্ত মানুষ, তুমি পা-ুলিপি থেকে কিছু পড়ে শোনাও’।

‘পড়তে শুরু করলাম।… উপন্যাসের একটি চরিত্র হাসু। পড়ার সময় ‘হাসু’ নামটি উচ্চারিত হতেই খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। সেদিকে তাকাতেই একজনকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দুজন হাসছে আর বলছে ‘এই যে হাসু, এই যে হাসু।’ যাকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল সে কবির জ্যেষ্ঠপুত্র হাসু’।

সেদিন উপন্যাসের দুটো অধ্যায় কবি শুনেছিলেন। তিনি বললেন, ‘ তোমার লেখার হাত তো খুব ভালো।’

উপন্যাসটি প্রকাশের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় লেখক ভীষণ মনোকষ্টে ভোগেন। এর মধ্যে গোলাম মোস্তফা সম্পাদিত ‘নওবাহার’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ১৯৫১-৫২ সালে এটি প্রকাশিত হয়। তখনো উপন্যাসটি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে এটি ১৯৫৫ সালে কলকাতা থেকে পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় এর আলোচনা বের হয়। ফলে এটি সহজেই সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং নানা মহলে এটি আলোড়ন সৃষ্টি করে।

লেখকের নিজের কথায়: ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিন পরই আমি করাচি বদলি হয়ে যাই। এর মধ্যে আর কবি জসীম উদ্দীনের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় ১৯৬১ সালে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তিনি রাইটারস গিল্ড-এর সম্মেলনে যোগ দিতে করাচি গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘ভাই ইসহাক আমি তোমার ওপর সুবিচার করিনি। তোমার উপন্যাসের কিছুটা তুমি পড়ে শুনিয়েছিলে। অতোটুকু শুনে তখন উপন্যাসটি মূল্যায়ন করতে পারিনি। এজন্য আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইবো কি, আমি নিজেই নিজকে ক্ষমা করতে পারছি না।’

আবু ইসহাক আরো লিখেছেন: ১৯৬২ সালে তিনি একবার আমার বাসায় গিয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘তোমার সূর্যদীঘল বাড়ী’ চেক ভাষায় অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডক্টর দুসন একদিন এসে আমাকে বললেন, ‘উপন্যাসে যেসব জায়গার উল্লেখ আছে সেসব জায়গায় তাকে নিয়ে যেতে হবে। তাকে নিয়ে দুদিনে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার স্টেশন, রেলস্টেশন, রেলওয়ে ওভারব্রিজ, নম্বরী কুলি, খুদে কুলি, ফতুল্লা স্টেশন ইত্যাদি সব ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছি। লোকটার নিষ্ঠা দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি’ (অম্লান স্মৃতি/স্মৃতি-বিচিত্রা-পৃ-১১১-১১৬)।

‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মুক্তিলাভ করে। দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার ‘স্মরণীয় দিন’ কলামে ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রের মুক্তিলাভের দিনটিকে ‘স্মরণীয় দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন। চলচ্চিত্রটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং ছয়টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে। বিদেশের কয়েকটি পত্রপত্রিকা চলচ্চিত্রটির রিভিউতে বলেছে: ঞযব সড়ারব রং নধংবফ ড়হ ধ ঢ়ড়বিৎভঁষ ংঃড়ৎু. বস্তুত তেতাল্লিশের মন্বন্তরকে কেন্দ্র করেই এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। বাস্তব জীবন ও সমাজের ছবি আবু ইসহাক তার কলমের তুলির টানে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছেন যেমন জয়নুল আবেদিন তার তুলির আঁচড়ে মন্বন্তরের বাস্তব জীবনের জীবন্ত ছবি এঁকেছিলেন এবং সার্থকতা অর্জন করেছিলেন। দুটোই শিল্পকর্ম। একজন কলম ব্যবহার করেছেন, অন্যজন তুলি।

‘সূর্যদীঘল বাড়ী’র সাফল্যের পর আবু ইসহাক আরো একটি বড় উপন্যাস লিখেছিলেন ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ নামে। এটিও পাঠক সমাজে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে। এর সম্পর্কে প্রফেসর কবীর চৌধুরী লিখেছেন: “তাঁর প্রথম উপন্যাসের মতো এটিও পল্লীজীবন ভিত্তিক, এখানেও জীবনবোধ তীক্ষè, বাস্তব জীবনের পরিবেশ অকৃত্রিম ও সত্যনিষ্ঠ। তবে ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’র চেয়ে বর্তমান উপন্যাসের পরিম-ল বৃহত্তর, জীবন সংগ্রামের চিত্র এখানে আরো দ্বন্দ্বমুখর ও তীব্র নাটকীয়তায় তা অধিকতর উজ্জ্বল এবং পটভূমি পরিবেশেও ভিন্নতর।… উপন্যাসটিতে লেখক একই সঙ্গে গভীরতা ও বিস্তার এনে একে এপিকধর্মী করার প্রয়াস পেয়েছেন। উপন্যাসের পটভূমি, ঘটনাবলীর বর্ণনা, চরিত্রচিত্রণ, সংলাপ সবই জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার স্পর্শম-িত। লেখক যে জীবনের ছবি এখানে এঁকেছেন তা তিনি ভালো করে মেনে নিয়েছেন, যেসব আঞ্চলিক শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন তা সুপ্রযুক্ত, রচনাটিকে তা এক ঋজু বলিষ্ঠতা দান করেছে।… দীর্ঘদিন পর (১৯৮৬) তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস প্রকাশিত হলেও আবু ইসহাক ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপহার দিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক হিসেবে তার পূর্ব খ্যাতি শুধু অমলিনই রাখেননি, আমার বিবেচনায় তাকে সম্প্রসারিত করেছেন।” অন্যপক্ষে যাদবপুর বিশ্ববদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ডক্টর সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ সম্পর্কে লিখেছেন: এই উপন্যাসের বর্ণনা প্রত্যক্ষ, পুঙ্খানুপুঙ্খ অথচ সংযত, অশ্লীল কাহিনীতে কোথাও শ্লীলতার অভাব দেখা যায় না।… ব্যভিচারের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ অথচ সংযত বর্ণনা আর কোথাও পড়িয়াছি বলিয়া মনে হয় না।… তিনি আরো লিখেছেন: এই উপন্যাসে জরিনার মতো চরিত্র এক শরৎচন্দ্রই আঁকিতে পারিতেন। একাধিকবার পড়ার পরও আমি এই চরিত্রটির রহস্য অনুধাবন করিতে চেষ্টা করি। বারংবার প্রশ্ন জাগে যদি হেকমত জীবিতাবস্থায় ফিরিয়া আসিত তাহা হইলে এই ধীরস্থির অবিচল নারী কি উত্তর দিত ইত্যাদি।

চতুরঙ্গ লিখেছেন: ‘আবু ইসহাকের এই উপন্যাসটি সাহিত্য রসাস্বাদক। টানাপোড়েন সমাজজীবনের জলজ্যান্ত নিখুঁত উপন্যাসটিকে ভরিয়ে তোলায় লেখক আর একবার প্রমাণ করলেন, নিছক কাহিনী নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পারিপার্শ্বিক অবস্থা জীবন সংগ্রাম, প্রেম যা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে ভাবায়, প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, কাঁদায় সেগুলোই সাহিত্যের আসল মূলধন। এই মূলধনকে সাহিত্য করে তোলায় আবু ইসহাকের ক্ষমতা অপরিসীম। তাই তার রচনা সমাজের রসকষহীন প্রিনটেড ডকুমেন্ট হয়ে ওঠেনি। আবু ইসহাক পাঠককে টেনে রাখার জাদু জানে না গ্রাম্য সেন্টিমেন্টের সঙ্গে ত্রিকোণ প্রেম, ত্রিকোণ প্রেমের সঙ্গে বাস্তববোধ, বাস্তববোধের সঙ্গে রাজনীতি সব মিলিয়ে একটি আদর্শ উপন্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে’ (এপ্রিল ’৮৭)।

এরপর লেখেন জাল (১৯৮৮)। এটি একটি নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস। হারেম (১৯৬২) এবং মহাপতঙ্গ (১৯৬৩) নামে তার দুটো গল্পগ্রন্থও রয়েছে। তার সবচেয়ে বড় কাজ সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান (১৯৯৩) রচনা। এটি তাকে কীর্তিমান ও উজ্জ্বল করেছে।

এই আবু ইসহাকের সঙ্গেই আমার পরিচয় ঘটেছিল ১৯৯৮ সালের কোনো এক সময় অলক্ত সাহিত্য পুরস্কারকে কেন্দ্র করে। এর আগে তার সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। শুধু কিছু লেখার সঙ্গে পরিচয় ছিল। তিনি যে অমায়িক, বন্ধুবৎসল, বিনয়ী, ভদ্র, সংবেদনশীল, মার্জিত ও সজ্জন ব্যক্তি তা পরিচয়ের পরই জানা গেল।

আবু ইসহাক খুব উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না। তিনি হই চইপ্রবণও ছিলেন না। তিনি ধীরস্থির আস্তে আস্তে কথা বলতেন। হেমন্তের নমিত শব্দের মতো। তার হাঁটাচলার মধ্যেও একটি সারল্য আমরা লক্ষ্য করি। তিনি সহজ, সরল। তিনি কথাবার্তায়/পোশাকে-আশাকেও ছিলেন আদর্শের প্রতীক। জাঁকজমক কিংবা চাকচিক্য তার পছন্দ ছিল না। তিনি সাদাসিধে জীবনই বেছে নিয়েছিলেন এবং সে জীবনকেই তিনি গভীর ভালোবেসেছিলেন। তার উপন্যাসের অনেক চরিত্রের মতোই ছিল তার দিনযাপন পদ্ধতি।

তিনি বাস্তব সত্য থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। তিনি জীবনে যা ভালো, যা শুভ এবং কল্যাণকর মনে করতেন তা করতে তিনি কখনো দ্বিধাবোধ করতেন না। নিজের মানসিক দৃঢ়তার মতো করেই তিনি তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো সাজিয়েছেন। চরিত্রচিত্রণে কোথাও তিনি গোঁজামিলের আশ্রয় নেননি। না জয়গুন না ঝরিনা উভয় চরিত্রই একটা বাস্তব আদর্শের ওপর উপস্থাপন করেছিলেন। ফলে দুই উপন্যাসে দুটো চরিত্রই সবার আকর্ষণের কারণ ঘটিয়েছে। তিনি চরিত্র নির্মাণেও প্রযতœশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
আবু ইসহাকের অহংবোধ ছিল, কিন্তু অহঙ্কার বোধ ছিল না। আবার জীবনে সবকিছু তিনি সহজে মেনেও নেননি। তার খুঁতখুঁতে একটি স্বভাব ছিল রবীন্দ্রনাথের মতো। তিনি যখন মঞ্চে বক্তৃতা দিতেন সেখানে তার গলার স্বর চড়া ছিল না। তিনি বক্তৃতায় কথামালা সৃষ্টি করতেন। তা দিয়েই তিনি শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। তার প্রত্যুপন্নমতিত্ব, বিচারবুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাকে এক অন্য মানুষে রূপান্তর করতো তখন। তিনি তখন সবার প্রিয় ভাষকে পরিণত হতেন।

৫ মে, ২০০১ সালে অলক্ত পুরস্কার অনুষ্ঠানে আবু ইসহাক একটি সংক্ষিপ্ত অথচ চিন্তাকর্ষক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, “পুরস্কার পেলে সবাই খুশি হয়। ব্যতিক্রম তেমন হয় না। বার্নাড শ ব্যতিক্রম ছিলেন। সবাই যেমন খুশি হয় আমিও তেমন খুশি হয়েছি। আমি যা লিখেছি তা খুবই সামান্য। তা যে আপনাদের ভালো লেগেছে তাই আমার সাহিত্যপ্রীতি। আপনারা যে আমাকে পুরস্কৃত করলেন সেজন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমাদের দেশে সাহিত্যিকরা অবহেলিত। বাংলাদেশের কিছু সাহিত্য সংস্থা আছে যারা সাহিত্যিকদের সাহিত্যের স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠান লেখকদের জন্য কল্যাণকর। আসলে আমি আমার ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’র নিচে চাপা পড়ে গেছি। এরপরও আমার উপন্যাস বেরিয়েছে ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’। এ উপন্যাস সম্পর্কে অনেকে জানে না। আপনারা পড়েছেন কি না জানি না। আজকের দিনটি আমার জন্য স্মরণীয়। অলক্ত সংগঠনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আমার ধন্যবাদ জানাই।”

আবু ইসহাক পুলিশ অফিসার ছিলেন। চাকরিকালে পুলিশকর্মেও তিনি দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। ন্যায়পরায়ণতা, নীতিবোধ, দৃঢ়চেতা মনোভাব, সাধুতা ও কল্যাণকামী পদক্ষেপ তার চরিত্রকে ঐশ্বর্য দান করেছে। তিনি পুলিশ অফিসার হিসেবে সৎ ছিলেন, সদগুণের অধিকারী ছিলেন। সর্বোপরি মানুষ ছিলেন। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই’ এই বিবেচনাও তার ছিল। সে কারণে তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। যাকে আমরা রাতদিন খুঁজে বেড়াই তিনিই সে মানুষ যাঁর অবস্থান ছিল আমাদের মধ্যেই। আজ তিনি নেই। অকস্মাৎ উটের গ্রীবার মতো মৃত্যু এসে তাকে ওপারে নিয়ে যায়।

[ad#co-1]