মেজর মাহমুদুল হাসানের পরিবারে শোকের ছায়া

major-mahmudul-hasanলামিসা ও তাসিনের আবদার ছিল বাবার সাথে নভোথিয়েটারে যাবে
জিলানী মিলটন
পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নিহত মেজর মাহমুদুল হাসানের স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা; ডানে মেজর মাহমুদ. আদরের সন্তান লামিসা ও তাসিন বাবার কাছে আবদার করেছিল তারা নভোথিয়েটারে যাবে। কাজের চাপে কিছুতেই সময় বের করতে পারছিলেন না তিনি। সামনে বিডিআর সপ্তাহ তাই আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তবনা দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তার। এক পর্যায় সিদ্ধান্ত নেন বিডিআর সপ্তাহ শেষে সন্তানদের আবদার পূরণ করবেন। স্ত্রীর পায়ে ব্যথা, ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন, কিন্তু সময় পাচ্ছিলেন না। আশ্বাস দেন দরবার হলের দরবার শেষে বিকেলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। কিন্তু কোনো আশাই পূরণ করে যেতে পারলেন না মেজর মাহমুদুল হাসান। তার আগেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছে দুনিয়া থেকে।
বিপথগামী বিডিআর জওয়ানদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান মেজর মাহমুদুল হাসান। স্বজনদের জন্য রেখে গেছেন শুধু স্মৃতি আর বুক ভরা আশা। প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে আছেন স্বজনরা। আদরের দুই সন্তান লামিসা (১০) ও তাসিন (৮) সারক্ষণ খুঁজে ফেরে তাদের প্রিয় বাবাকে। মুখে কথা নেই, দু’জন এক জায়গায় নীরবে বসে থাকে সারাক্ষণ। শোকে পাথর হয়ে আছেন স্ত্রী আইরিন মাহমুদ পিয়া। যেন তার চোখে মুখে পাহাড় সমান চিন্তার ছাপ। গতকাল খিলগাঁওয়ের বাসায় কথা হয় এই শোকাহত পরিবারটির সাথে। স্বজনদের কেউই ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। স্বামীর রেখে যাওয়া স্মৃতি তুলে ধরেন আইরিন মাহমুদ। বলেন, সন্তানদের নিয়ে কতই না আশা ছিল তার। সব সময় বলতেন কিছু চাই না, লামিসা ও তাসিন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবে এটাই দেখে যেতে চাই। কিন্তু সে আশা তার পূরণ হলো না। তিনি আরো বলেন, লামিসা ও তাসিন তাদের বাবার কাছে বায়না ধরেছিল নভোথিয়েটার ও জাদুঘর দেখবে বলে। কিন্তু কাজের চাপে তিনি পেরে উঠছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিডিআর সপ্তাহ শেষ হলে আমাদের নিয়ে নভোথিয়েটার ও জাদুঘর দেখতে যাবেন। এমনকি ২৫ তারিখ বিকেলে আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
২৫ ফেব্রুয়ারির সেই লোমহর্ষক ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে আমরা বিডিআর সদর দফতরে আছি। অফিসার্স কোয়ার্টারের ঊর্মি ভবনের নিচতলায় আমাদের বাসা। প্রতিদিনের মতো ওই দিন সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হন মেজর মাহমুদুল হাসান। দরবার হলে মিটিংয়ে যাচ্ছেন বলে জানান। হঠাৎ সকাল সাড়ে ৯টায় গুলির শব্দ। কিছু বুঝে উঠছিলাম না। কিছুক্ষণ পর মেজর মাহমুদ তাকে মোবাইলে ফোন করে জানান, বিডিআর সদস্যরা আমাদের বাইরে থেকে বìধ করে রেখেছে, তোমরা সাবধানে থেকো। এর মধ্যে বাইরে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় মেজর মাহমুদ দ্বিতীয় দফায় তার কাছে ফোন করে জানতে চান বাইরে বিডিআর সদস্যরা জড়ো হয়ে আছে কি না। এরপরই তার মোবাইল ফোন বìধ হয়ে যায়। সারা দিনে শত চেষ্টা করেও তাকে আর মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছিল না। এ দিকে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হলে তিনি লামিসা ও তাসিনকে নিয়ে ঘরের দরজা বìধ করে রান্নাঘরে লুকিয়ে থাকেন। দুই সন্তানকে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন। দুপুর ১২টায় এক দল বিডিআর সদস্য বাসার সামনে এসে দরজায় লাথি মারে। এভাবে কয়েক দফা চেষ্টা চালিয়ে দরজা ভেঙে তারা ভেতরে প্রবেশ করে। বাসার মালামাল ভাঙচুর করে। অস্ত্রের মুখে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কোয়ার্টার গার্ডে। সেখানে টানা ৩৬ ঘন্টা জিম্মি অবস্খায় কাটান। পানি ছাড়া কিছুই খাননি তারা। আইরিন বলেন, ২৬ তারিখ বিকেলে যখন জিম্মি অবস্খা থেকে মুক্ত হই তখন বিডিআর সদস্যরা বলেছেন, ‘স্যারের কিছু হবে না, আপনারা চলে যান।’ ওদের কথায় বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু আসেনি। তাকে বাঁচতে দেয়নি ওরা। ২৮ তারিখ মধ্য রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে তার (মেজর মাহমুদুল হাসান) লাশ খুঁজে পাই। কেন এই নির্মমতা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজনরা। স্বজনহারা পরিবারটির একটাই দাবি এই হত্যাযজ্ঞ যারা ঘটিয়েছে তাদের উপযুক্ত বিচার হোক।