মুন্সীগঞ্জের শতবর্ষী ৭ স্কুল

এম মামুন হোসেন ও শহীদ-ই-হাসান তুহিন
বাংলায় মুসলিম শাসনের আগেই ইতিহাস খ্যাত বিক্রমপুরে আধুনিক জনপদ গড়ে উঠেছিল। সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ বিশ বাঙালির একজন অতীশ দীপঙ্কর এ অঞ্চলেরই সন্তান। ইতিহাসের এ ধারাবাহিকতায় দেশের শিক্ষা বিস্তারে শত বছর ধরে অবদান রাখছে এখানকার সাতটি বিদ্যালয়। শতবর্ষ অতিক্রম করেছে জেলার মুন্সীগঞ্জ হাই স্কুল, কাজির পাগলা ইন্সটিটিউশন, ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, স্বর্ণগ্রাম আরএন উচ্চ বিদ্যালয়, সোনারং বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, আব্দুল্লাহপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং পাইকপাড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়।
মুন্সীগঞ্জ হাই স্কুল : অতিপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের নাম মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী হাই স্কুল। ১৮৮৫ সালে মুন্সীগঞ্জ শহরের পুরনো কাচারি এলাকায় এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতার সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে এলাকার কিছু বিদ্যোৎসাহী প্রথিতযশা ব্যক্তি এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) কমল চন্দ্র আইচ জানান। দেশের অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
সুপরিচিত এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুল আউয়াল, সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ও দ্য ইনডিপেনডেন্টের সম্পাদক মাহাবুবুল আলম, ওর্য়ার্কাস পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলাম, সাবেক এমপি জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই, সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ডিন প্রয়াত অধ্যাপক সুনেন্দু চন্দ্র নারায়ণসহ অনেক গুণী ব্যক্তি। এ স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোক্ষদা চরণ বসু।
বর্তমানে এ স্কুলটির অবস্থা আগের মতো নেই। নানা সমস্যার কারণে রেজাল্ট খুব একটা ভালো করতে পারছে না ছাত্ররা। এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৭৪ ভাগ হলেও কেউ জিপিএ-৫ পায়নি। এ গ্রেডে তিনজন, এ মাইনাস তিনজন পেয়েছে। বর্তমানে স্কুলে মোট ৬৭৭ জন ছাত্র রয়েছে।
ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দুজন শিক্ষকসহ কিছু লোকবলের অভাব রয়েছে বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য রয়েছে। ফলে সহকারী শিক্ষক কমল চন্দ্র আইচ বিএ (অনার্স), এমএ, এমএড ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কাজীর পাগলা ইন্সটিটিউশন : মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কাজীর পাগলা গ্রামে ১৯০১ সালে কাজীর পাগলা এটি ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষানুরাগী অভয় তালুকদার এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন নন্দলাল কু-ু। স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ হিসেবে লৌহজং উপজেলায় পরিচিত এ স্কুল। বহু জ্ঞানী, গুণী এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বিপ্লবী জিতেন ঘোষ এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বরাবরই এ স্কুলের ফল খুব ভালো। বর্তমানে স্কুলটির দোতলা ভবন রয়েছে। পাশেই রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। এ স্কুলে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার। শিক্ষক রয়েছেন ১৬ জন। প্রধান শিক্ষক ক্যাপ্টেন (অব.) মো. নজরুল ইসলাম অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে স্কুল পরিচালনা করছেন।
ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় : লৌহজং উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁওয়ে ১৯০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রাহ্মণগাঁও পদ্মানদীর গর্ভে হারিয়ে গেলে স্কুলটির শুরু হয় অনিশ্চিত পথ চলা। নদী ভাঙার কারণে বর্তমানে স্কুলটি দোতলা ভবন নিয়ে তেউটিয়া ইউনিয়নের পাইকারা গ্রামে স্থানান্তর করা হয়েছে। তারপরও পদ্মা এ স্কুলের পিছু ছাড়ছে না। আবারো ভাঙনের মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে স্কুলের অনেকখানি মাঠ ও ভবনের অংশ পদ্মাগর্ভে চলে গেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইছে, এবার বাঁধ নির্মাণ করে স্কুলটি বাঁচাতে। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতার সঠিক পরিচয় কেউ বলতে পারেন না। কেউ বলেন, বিখ্যাত রাজনীতিবিদ সরোজিনী নাইডু আবার কেউ বলেন, কোনো এক ব্রাহ্মণ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদ জানান, বর্তমানে স্কুলে এক হাজারের ওপরে ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এসএসসিতে ৫ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। ২০০৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জেলায় সবচেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছিল এ স্কুলের ছাত্রী স্বর্ণা রেজা। পাসের হার ৮২%। স্কুলটি বাঁচাতে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধান শিক্ষক আবদুল মজিদ মিয়া বলেন, ফলের দিক থেকে স্কুলটি জেলাতে বরাবরই ভালো করে আসছে। কিন্তু স্কুলটি অবকাঠামো দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাই স্কুলের বর্তমান পারফরম্যান্স ধরে রাখার জন্য এর অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
স্বর্ণগ্রাম আরএন উচ্চ বিদ্যালয় : মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার স্বর্ণগ্রামে ১৮৯৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্বর্ণগ্রাম আরএন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষানুরাগী গুরু প্রসাদ সেন। বর্তমানে এ স্কুলে ছাত্রছাত্রী রয়েছে ৯০০। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হাই জানান, স্বর্ণগ্রাম হাই স্কুল জেলার ভালো স্কুলের একটি। শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে আসছে। ১০০ বছরের ওপরে স্কুলটি সগৌরবে চলছে।
সোনারং বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় : সোনারং বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার সঠিক নাম জানা নেই কারো। ১৯০০ সালে এ স্কুলটি টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে যাত্রা শুরু করে। উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী সাহিত্যিক সত্যেন সেনের বাড়ির কাছেই এ স্কুলটি। তার স্বজনরা এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে এলাকার লোকজন জানান। সত্যেন সেনও এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন। জেলার ভালো স্কুলের মধ্যে এর নাম সুপরিচিত। বরাবরই ছাত্রছাত্রীরা ভালো রেজাল্ট করে আসছে। বর্তমানে এ স্কুলে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে।
আব্দুল্লাহপুর উচ্চ বিদ্যালয় : টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামে ১৮৯৯ সালের ১ জানুয়ারি আব্দুল্লাহপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতার সঠিক নাম জানা যায়নি। বর্তমানে স্কুলটিতে এক হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী রয়েছে। প্রধান শিক্ষক পরিমল চন্দ্র সাহা জানান, স্কুলটির খ্যাতি রয়েছে জেলায়।
পাইকপাড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় : টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে ১৯০৪ সালে পাইকপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতার নাম জানা যায়নি। বর্তমানে এ স্কুলে ১ হাজার ১১০ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক প্রদীপ চন্দ্র জানান, স্কুলটির সুনাম সর্বজন বিদিত। ছাত্রছাত্রীরা ররাবরই ভালো রেজাল্ট করে আসছে। লেখাপড়ার রয়েছে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ।