পদ্মা সেতুর নকশা

নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নে একাজ শেষ করতে হবে
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে আসন পেয়েছে ২৩০টি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জয়ী ৩টি আসনের ২টি ছেড়ে দেয়ায় ৬ জানুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কথা ছিল ২২৮ এমপির। কিন্তু শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেখা যায় শপথ নিয়েছেন ২২৭ এমপি। বাকি একজন এমপি অনুপস্থিত ছিলেন। একজন এমপি কেন অনুপস্থিত, তা খুঁজে বের করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য। ঘন-কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ থাকায় এবং ঘাটের উভয় পাড়ে দীর্ঘ যানজট লেগে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একজন এমপি নির্ধারিত সময়ে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। ওই এমপি অবশ্য পরের দিন শপথ নেন। কিন্তু পদ্মা নদীর ওপর একটি ব্রিজের অভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওই এমপি তার দলের এমপিদের সঙ্গে একসঙ্গে শপথ নিতে পারলেন না। এ দুঃখ তিনি হয়তো আগামী পাঁচ বছর বয়ে বেড়াবেন। তার দুঃখের হয়তো তখনই অবসান হবে, যখন তার দলের এমপিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পদ্মার ওপর একটি সেতু নির্মিত হবে এবং সেই সেতুর ওপর দিয়ে মাত্র তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ রাজধানী ঢাকায় চলে আসবে।
পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী ওয়াদা। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরপরই তাদের যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সেই নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নে ২০১৩ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্নর ঘোষণা দেন। ২০১৩ সালের মধ্যে যদি আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে তা নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের আরেকটি মাইলফলক বলে বিবেচিত হবে।
এর আগে বলা হয়েছিল, পদ্মা সেতুর বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ শুরু হবে ২০০৯ সালের জুনে। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নে জানুয়ারিতেই পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষে একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি। এশীয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহায়তায় এ প্রকল্পের কাজ করবে নিউজিল্যান্ডের কোম্পানি ম্যানসেল লিমিটেড অ্যাকম। প্রকল্পের সময় ধরা হয়েছে ২২ মাস। তবে এর আগেই পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা যায়, ১৯৯৯ সালেই ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুর জেলার জাজিরার মধ্যে ৫.৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছিল। ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সে অনুযায়ী কাজ হলে ২০০৬ সালেই এ সেতু চালু করা যেতো। কিন্তু ২০০১ সালের শেষ দিকে জোট সরকার ক্ষমতায় এসেই পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয়। সেতুর স্থান নির্ধারণ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে সাবেক জোট সরকার তাদের ক্ষমতার পুরো পাঁচ বছর শেষ করে। পদ্মা সেতুর কাগজপত্র ফাইলে বন্দি থাকে তাদের সরকারের পাঁচ বছরসহ পরের আরো দুবছর। এখন এ সরকার ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতুর নকশার কাজে আবার হাত দিল। আশা করা যায়, এ সরকার একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করলে তাদের শাসনামলের শেষ দিকে বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর চেয়েও ১ কিলোমিটার বেশি দৈর্ঘ্যরে একটি পদ্মা সেতু পেতে যাচ্ছে।
৫.৫৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২৫ মিটার প্রস্থের চার লেনবিশিষ্ট পদ্মা সেতুতে থাকবে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা, ৪০০ কিলোভোল্ট ক্ষমতার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের গ্যাস সঞ্চালন লাইন এবং আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। এ সেতু নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এতো টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে ওই অঞ্চলের শিল্পায়নসহ মংলা বন্দরের কার্যক্রমে গতি বাড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ গ্যাস পাবে।
তাই আমরা মনে করি, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বর্তমান সরকার পদ্মা সেতুর কাজ শুরু ও শেষ করবে। এতে তাদের নির্বাচনী ওয়াদাও বাস্তবায়ন হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি বৃদ্ধি পাবে।