সমাজকে কীভাবে দেখতে চাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সমাজকে কীভাবে দেখতে চাই না সেটাই আগে বলি। দেখতে চাই না রাজনীতিবিমুখ হিসেবে। মনে হতে পারে যে, চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে চাচ্ছি কিংবা হাস্যকর কিছু বলছি; কিন্তু বিষয়টা খুবই জরুরি। বিশেষ করে যে জন্য কথাটাকে চাঞ্চল্যকর বা হাস্যকর শোনাতে পারে সে পরিপ্রেক্ষিতের কারণেই রাজনীতিবিমুখতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সবাই এখন রাজনীতিকদের গালমন্দ করেন। ছাত্ররাজনীতি অত্যন্ত ক্ষতিকর; তাই তাকে নিষিদ্ধ করা চাই, শিল্পকারখানায় রাজনীতি ঢুকে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ ঘটাচ্ছে, রাজনীতিকরা হরতাল ডাকে, সন্ত্রাসের লালনপালন করে এসব আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন সামরিক শাসন আসে, অথবা সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় থাকে, যেমনটা সম্প্রতি ঘটেছিল; তখন কথাগুলো আরও বেশি করে ছড়ানো হয়। রাজনীতিকরা অসৎ, দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য এমন আওয়াজও তোলা হয়। সব দোষ যেন রাজনীতিকদেরই। যেন ব্যবসায়ী, আমলা, বিভিন্ন পেশার মানুষÑ এরা সবাই সৎ, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ প্রায় ফেরেশতা। আর এমন একটা ভাব করা হয় যে, রাজনীতি কেবল তথাকথিত রাজনীতিকরাই করেন, অন্যরা সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

রাজনীতিকরা যে খারাপ কাজের জন্য বেশ ভালোভাবেই দায়ী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা অনেকেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন, কেউ কেউ শাস্তিও পেয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের শাসনামলে নষ্ট লোক হিসেবে এরা চিহ্নিত হয়েছেন। গণমাধ্যমে তাদের কর্মকা-ের জীবন্ত বর্ণনা পাওয়া গেছে। সবই ঠিক; কিন্তু অসুবিধা হলো এই যে, এসব প্রচার-প্রচারণার ফলে সমাজের মানুষ না আবার রাজনীতির ওপরই বিমুখ হয়ে পড়েন সেই আশঙ্কাটা। রাজনীতিকদের অপরাধ না আবার রাজনীতির কাঁধে চেপে বসে। বলাবাহুল্য, তাতে সমাজের কোনো মঙ্গল হবে না, সুবিধা হবে অসামরিক ও সামরিক আমলাদের। রাষ্ট্র যখন আছে, তখন রাজনীতি থাকবেই, থাকতে বাধ্য। রাজনীতিকরা যদি রাজনীতি থেকে বিতাড়িত হন তাহলে আমলাদের ভারি সুবিধা, তারা অবাধে ও চুটিয়ে রাজনীতি করতে পারবেন। জবাবদিহিতার কোনো দায় থাকবে না, স্বচ্ছতার প্রশ্ন হবে অবান্তর; আমলরা দৃশ্যমান থাকবেন না, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নির্বিচারে প্রয়োগ করতে পারবেন। বলাবাহুল্য, ওই ক্ষমতার ব্যাপারটাই হচ্ছে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতা কার কাছে থাকবে সেটাই হলো রাজনীতির মৌলিক ও প্রধান প্রশ্ন। ক্ষমতা যদি রাজনীতিকদের অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে না থাকে তাহলে জনগণের লাভ তো হবেই না, বরং ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। কারণ অনির্বাচিত ক্ষমতাধররা যা ইচ্ছা তাই করবেন, অথচ তাদের দায় থাকবে না জবাবদিহিতার। রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রপরিচালক, তাই রাজনীতিকে উপেক্ষা করব সে সাধ্য আমাদের কোথায় ও কতটুকু?

আগামী দিনে তাই আমরা চাইব যে, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা যেমন ক্ষোভ-বিক্ষোভও তেমনই রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজে পায়। বলাবাহুল্য বিদ্যমান রাজনীতিতে আন্দোলন জিনিসটা তেমন নেই; সে জন্য যা দরকার হবে, তা হলো বিকল্প গণতান্ত্রিক আন্দোলন। আর এ আন্দোলন সংস্কৃতির একটা বড় ভূমিকা থাকা অত্যাবশ্যক। কেননা সংস্কৃতি আসলে রাষ্ট্রের চেয়েও গভীর এবং সমাজের চেয়েও স্থায়ী।

সংস্কৃতির এ ব্যাপারটাকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিইনি। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে বটে, কিন্তু তা গভীর ও স্থায়ী হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রের ভাঙাগড়ার ফলেও সংস্কৃতির যে খুব একটা উন্নতি হয়েছে তা বলা যাবে না। সংস্কৃতিতে গানবাজনার জায়গাটা খাটো নয়। সংস্কৃতির একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে সুস্থ বিনোদন সরবরাহ করা। কিন্তু আনন্দদানের সঙ্গে সঙ্গে এবং তার মধ্য দিয়েই সংস্কৃতি আরও একটা কাজ করে সেটা হলো এই যে, সংস্কৃতি মানুষকে সামাজিক করে তোলে। তাকে দর্শন ও ইতিহাসের বিষয়ে অবহিত করে। বস্তুত সামাজিকতা, দার্শনিকতা ও ইতিহাস চেতনা যদি না থাকে তাহলে কাউকে পুরো মানুষ বলা সম্ভব নয়, তা আসলে আকারে যে ব্যক্তি যতই মনুষ্যসদৃশ হোক না কেন। সে জন্যই আমরা এমন ধরনের সংস্কৃতিচর্চা চাইব যাতে একই সঙ্গে বিনোদন, দার্শনিকতা ও ইতিহাস চেতনা লাভ করা যায়। এবং মানুষ আরও বেশি সামাজিক ও যৌথ চেতনাসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। রাজনীতিবিমুখতা দূর করার বেলায় সংস্কৃতির অনুশীলন মস্ত বড় একটা ভূমিকা পালন করতে পারে।

সংস্কৃতির অনুশীলনে পাঠাগার খুবই প্রয়োজনীয়। সবাই বলেন, বই পড়ার অভ্যাস এখন কমে যাচ্ছে। তার একটা কারণ অবশ্যই এই যে, বই পড়ার সুযোগ তেমন নেই। বইয়ের দাম অনেক, এমনকি পড়া হয়ে গেলে বই যে আপনি রাখবেন এমন জায়গারও অভাব। কোন বইটা জরুরি সেটা যে বলে দেবে এ রকম লোকেরও বিলক্ষণ অভাব। এক সময়ে পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার দেখা যেত। এখন সেগুলো উঠে গেছে। মানুষের বর্ধিষ্ণু বিচ্ছিন্নতার এটি একটি প্রমাণ বটে। অপরদিকে ধর্ম ব্যবসায়ীরা ওয়াজ মহফিল, মক্তব মাদ্রাসা, এমনকি মসজিদকেও ব্যবহার করে এমন সব প্রচার চালায়, যেগুলো সামাজিক অগ্রগতিকে প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে পাঠাগার হতে পারে একটি ভরসার জায়গা। পাঠাগার মানুষকে নিজ নিজ ঘরে ও নিজের গ-ির বাইরেও টেনে আনবে। পাঠাগারে কেবল যে বইপুস্তকের সঙ্গে জানাশোনা হবে তা নয়, পারস্পরিক যোগাযোগও ঘটবে। মানুষ আসবে বই নিতে, খবরের কাগজ পড়তে, সাময়িক পত্রিকার খবর নিতে, পাঠাগারকে কেন্দ্র করে আলাপ আলোচনা, নানা বিষয়ে বিতর্ক, বিশেষ বিষয়ে বক্তৃতা, দেয়ালপত্রিকা প্রকাশ, বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ইত্যাদির আয়োজন করা খুবই সম্ভব। প্রতিটি পাঠাগারকে একটি সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে দেখা যেতে পারে। খুব সুবিধা হবে মেয়েদের। প্রথম প্রথম তারা হয়ত আসতে পারবে না। কিন্তু তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা নিশ্চয়ই অসম্ভব হবে। তা ছাড়া বাবা, ভাই, স্বামী এবং অন্য আত্মীয়দের সাহায্যেও তারা বই নিতে পারবে পাঠাগার থেকে। মেয়েদের অবরুদ্ধদশা ভাঙতে পাঠাগার কত যে উপকারী হতে পারে তার হিসাব করা কঠিন। কিশোরদের জন্য যাওয়ার জায়গা নেই, তাদের জন্য বিনোদনের উপায়গুলো সামান্য, পাঠাগার তাদেরকে আশ্রয় দেবে। কেবল বই পড়, বই পড় বললে হবে না, বইয়ের মোড়ক উন্মোচনও যথেষ্ট নয়, বইমেলা সাময়িক, বইয়ের জন্য চাই পাঠাগার, পাড়া-মহল্লা, শহরেÑ সর্বত্র অসংখ্য পাঠাগার দরকার।

পাঠাগার গড়া একটা সামাজিক আন্দোলন হতে পারে। কেন্দ্রীয়ভাবে শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে স্থানীয়ভাবেও গড়ে তোলা যায়। এলাকার শিক্ষিত মানুষ, শিক্ষক, চিকিৎসক নানা ধরনের পেশাজীবী, ব্যবসায়ী সকলের ভেতরেই একটি সাংস্কৃতিক মন রয়েছে। আবেদনটা সেখানে পৌঁছে দিতে পারলে নিশ্চয়ই তারা সাড়া দেবেন। বাজারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কামরায়, কারও গৃহের অতিরিক্ত জায়গায় পাঠাগার গড়ে তোলা যেতে পারে; ইউনিয়ন কাউন্সিল, থানা কাউন্সিলের দালানকোঠাতেও জায়গা খোঁজা অন্যায় নয়। সরকারি অনুদান পেলে ভালো, না পেলে নিজেদের ওপরই নির্ভর করার উদ্যোগ নিতে হবে। অনেকেই আছেন, যারা স্থানীয় হলেও বাইরে থাকেন, এমনকি বিদেশেও রয়েছেন, তাদের মধ্যেও এমন মানুষ পাওয়া যাবে, যারা সমাজের উপকার করতে চান, উপকার করতে হলে অন্যকিছু করার আগে পাঠাগারের ব্যাপারে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা আবশ্যক। পারিবারিক স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যও পাঠাগার গড়াই সর্বোত্তম। কবরস্থান ও স্মরণসভায় আর ক’জন যায়, পাঠাগারে যাওয়ার লোক বাড়বে, বরং কমবে না। তবে উদ্যোগটাকে হতে হবে সামাজিক। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ তেমন একটা এগুবে না।

সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য নতুন গান তৈরি হবে বলে আশা করব। সব মানুষের মধ্যেই গান রয়েছে, রয়েছে গায়ক ও শ্রোতা, সেই সুপ্ত মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা চাই। কেবল একক গান নয়। সমবেত গানও চাই। সমবেত গানই বরং অধিক প্রয়োজনÑ বর্তমান বিচ্ছিন্নতার পটভূমিতে। পাশাপাশি দরকার হবে চলচ্চিত্র আন্দোলন। চাইব নাটক ও আবৃত্তির অনুশীলন। আশা করব খেলাধুলার চর্চা বাড়বে। সুস্থ জীবনের জন্য খোলা মাঠ যে কত দরকার সেটা মনে হয় আমরা ভুলতে বসেছি। এ ভুলে যাওয়াতে সর্বনাশের আগমন নিশ্চিত হচ্ছে। নদী ও জলাশয়কে উপেক্ষা করার ব্যাপারটা আরও বড় রকমের অশনি সঙ্কেত। নদীর সঙ্গে বিনোদনকে যুক্ত করা সম্ভব। নৌকাবাইচ ও সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন তো তেমন একটা কঠিন ব্যাপার নয়। ক্রিকেটের চর্চা চলছে কিন্তু আরও জরুরি হচ্ছে ফুটবল। ফুটবলের দ্রুততা, আয়োজনের সহজ ব্যবস্থা ও উত্তেজনা আমাদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ফুটবলকে উপেক্ষা করাটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না।

টেলিভিশন আছে এবং থাকবেই। তবে টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোর ওপর চাপ দেয়া দরকার যে, তারা যেন কেবল পণ্যের একচেটিয়া বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা না হয়ে ওঠে, বিজ্ঞাপন প্রচার ও বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনে বিনোদন সরবরাহের পাশাপাশি যেন দর্শন, ইতিহাস এবং পরিবেশ বিষয়ে অনুষ্ঠান থাকে। আর টকশো তো অনেক হয়েছে। এখন ক্ষমা করে দেয়া যেতে পারে। তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজন বরং বেশি উপকারী হবে। টেলিভিশনের মালিকদের এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে, বক্তব্যপ্রধান আলোচনা ও বিতর্ক, তথাকথিত টকশোর তো অবশ্যই। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে নাচ-গানের তুলনাতেও জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। যেসব অনুষ্ঠানের কথা বললাম, তাতে ব্যক্তির চেয়ে বক্তব্যই প্রধান হবে এবং কেবল নামকরা লোক নয়, তরুণ প্রজন্মের সদস্যদেরও ডাকা ভালো হবে, যদি তেমন সদস্যদের কাছে বিবেচনাযোগ্য বক্তব্য পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুন্দর ভাষা অবশ্যই চাইব, কিন্তু দেখতে হবে যে বক্তা সুন্দর সুন্দর শব্দের সাহায্যে কি বলছেন বা বলছেন না।

একই কথা সংবাদপত্র সম্পর্কেও সত্য। সেখানেও অঙ্গশোভা ও রঙের অকৃপণ প্রাচুর্যের চেয়ে অধিক জরুরি হচ্ছে সংবাদ ও তত্ত্ব। তত্ত্ব দরকার, দর্শন ও ইতিহাস চাই। উপসম্পাদকীয়ের সংখ্যা কমালে ক্ষতি নেই, তবে বাড়াতে হবে বক্তব্য। সংবাদপত্র অবশ্যই শিক্ষক হবে না, তবে নিশ্চয়ই বন্ধু হবে মানুষের। খবর তো দেবেই। সে জন্যই তো খবরের কাগজ, কিন্তু খবর দেয়ার সময় কেবল মালিকের বা মালিকেরও বড় যে মালিক বিশ্ব পুঁজিবাদ তাদের স্বার্থ দেখবে না, দেখবে দেশের মানুষের স্বার্থ। দেখলে জনপ্রিয়তা বাড়বে এবং বিজ্ঞাপনদাতারাও আকৃষ্ট হবে। ওই যে বিকল্প রাজনৈতিক আন্দোলনের কথা বললাম, আশা করব তার খবর কোণঠাসা হবে না, বরং সমাজ বদলের স্বার্থে অধিক গুরুত্ব পাবে। তবে এসব ব্যাপারে মালিকদের প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর না করে গণমাধ্যমে যে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী রয়েছেন তাদের ওপর ভরসা রাখব; যতটা রাখার।

শিক্ষার ব্যাপারটা সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সেখানে কি ঘটছে সেদিকটাতেও চোখ রাখা চাই। দেখানো হচ্ছে যে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ফল খুব ভালো হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা উচ্চহারে তারকা পাচ্ছে। তাতে করে গুণগত উন্নতি যে কতটা হচ্ছে, তা অবশ্য বলা মুশকিল। তবে একটা জিনিস খুবই পরিষ্কার, সেটা হলো সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে না; ছেলেমেয়েরা কে কতটা স্বার্থহীনভাবে চিন্তা করতে পারছে, তার পরীক্ষা হচ্ছে না। স্মৃতিশক্তির যান্ত্রিক ব্যবহারের সাহায্যে ঠিক জায়গাতে টিক চিহ্ন দিতে পারার দক্ষতা দেখিয়ে বাহবা পাচ্ছে। মেধা, মনন ও নিজেকে ব্যক্ত করার শক্তিকে বিকশিত না করে উল্টো কৈশোরেই বন্ধ্যত্বের বীজ বপন করে দেয়ার কাজটি চলছে আমাদের শিক্ষালয়গুলোতে। কৈশোর পেরিয়ে কলেজ পর্যায়ে এসে ছেলেমেয়েরা সেখানে আসন সংখ্যা সীমিত, আরও ওপরে উঠে দেখে অধিকাংশের জন্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশদ্বার অবরুদ্ধ। চোখ মুছতে তারা গিয়ে হাজির হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নানা প্রকার কটূ মন্তব্য করা স্বাভাবিক বটে। কিন্তু এরা যে একটি সামাজিক চাহিদার ফসল, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। আমরা আরও অধিকসংখ্যক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যাতে করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খ-িত শিক্ষাদান গ্রহণযোগ্যতা হারায়। আর ইতোমধ্যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে মাতৃভাষার চর্চাসহ দর্শন ও ইতিহাস পাঠদান অভিভূত হবে এমনটাও আশা করব। কেবল বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ও কম্পিউটার অপারেটর তৈরি করলে চলবে না। পূর্ণাঙ্গ মানুষ সৃষ্টি করতে হবে। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কেবল টিক দেয়া নয়, স্বাধীনভাবে বাংলা ও ইংরেজিতে রচনা লেখার ক্ষমতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি নির্মম হুমকি। এর মোকাবেলা করার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই উদ্যোগ আবশ্যক। জলবায়ু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারে গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা আমরা অবশ্যই আশা করব। কেননা বিষয়টার সঙ্গে এ জনপদের টিকে থাকা না থাকার প্রশ্নটি জড়িত।

যে বিষয়েই চিন্তা করি না কেন, কোনো কিছুই আপনা-আপনি ঘটবে না। চাপ দিয়ে হবে। চাপটা অন্য কিছু নয় জনমতের। কিন্তু জনমত জিনিসটার তো বায়বীয়ই রয়ে যায়, যদি না তা সংগঠিত রূপ নেয়। আর সংগঠিত রূপ অন্য কিছু নয়, রাজনৈতিক আন্দোলন ভিন্ন। সে জন্যই বলছিলাম আর যাই চাই না কেন রাজনৈতিক বিমুখতা চাইবার কোনো অবকাশই নেই। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা স্মরণে আসে। সে আন্দোলন মূলত ছিল রাজনৈতিক, কিন্তু তার ভেতরে ছিল সমাজ প্রগতির আকাক্সক্ষা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক লক্ষ্যটি অর্জিত হয়েছে, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা একটু স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি, আগামীর প্রত্যাশাটা ওই সামাজিক মুক্তিরই। কিন্তু সে প্রত্যাশা রাজনৈতিক কার্যক্রমকে বাদ দিয়ে যে পূরণ এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ওই বোধটা খুবই জরুরি। কেননা বোধ যদি প্রেরণা না জোগায় তাহলে এগিয়ে যাওয়াটা অসম্ভব বৈকি।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক