মুন্সীগঞ্জে নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে : প্রার্থীরা ব্যস্ত মিটিং মিছিল আর গণসংযোগে

আবু সাঈদ সোহান মুন্সীগঞ্জ
মুন্সীগঞ্জে নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে। প্রার্থীরা ব্যস্ত মিটিং-মিছিল, গণসংযোগ আর শোডাউনে। বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি তথা চারদলীয় জোট মনোনীত প্রার্থীরা জয় নিশ্চিত করতে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্য দিকে মহাজোটের মনোনীত প্রার্থীরাও জয় পেতে মরিয়া। ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জ ১ ও ২ আসনে নির্বাচনী জনসভা করে গেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে সফর করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তবে ভোটাররা এবার অনেক সচেতন। তারা সৎ, যোগ্য ও দেশের কল্যাণে কাজ করবেন এমন প্রার্থী খুঁজছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমাবেন এমন সরকার তারা চাচ্ছেন। তাই কে জিতবেন আর কে হারবেন তা বলা কঠিন।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলা বরাবরই বিএনপি’র ঘাঁটি বলে পরিচিত। জেলায় মোট ভোটারসংখ্যা ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৯৭৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ২৮ হাজার ৫২৬ এবং মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৮। ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৩৮৬টি। গতবারের নির্বাচনে চারটি আসন ছিল। চারটিতেই বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। পরে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে উপনির্র্বাচন হলে সেখানে বিকল্প ধারার প্রার্থী মাহী বি. চৌধুরী বিজয়ী হন। জেলায় প্রতিটি আসনেই রয়েছেন হেভিওয়েট প্রার্থী। তারা সবাই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

মুন্সীগঞ্জ-১ : এ আসনের যুক্তফন্সন্ট মনোনীত প্রার্থী এ কিউ এম বদরুদ্দোজা বলেন, এবার নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেউ পাবে না। অনেক দল মিলে সরকার গঠন করতে হবে সে ক্ষেত্রে আমরাও সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারি। বিরোধী দল হলে অ্যাগ্রেসিভ হব না সংসদ ছেড়ে যাব না, হরতাল করব না। চারদলীয় জোট প্রার্থী শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, দু’বছর আগে নির্বাচন হতে পারত। কিন্তু লগি-বৈঠার তাণ্ডবে তা হয়নি। কারা লাশের ওপর নৃত্য করেছে তা জনগণ দেখেছে। আমি এখানে অনেক উন্নয়ন করেছি। আশা করি জনগণ তা ভুলে যায়নি। একই আসনে মহাজোট প্রার্থী সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেন, মানুষ এখন নৌকার পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। চারদলীয় সরকার আমলে খেটে খাওয়া মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী ছিল। তাই জনগণ এখন পরিবর্তন চাচ্ছে। এ ছাড়া তারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি করেছে যার জন্য জনগণ এবার নৌকা প্রতীকে ভোট দেবে। এ ছাড়া এ আসনে রয়েছেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের গোলাম মোস্তফা সেন্টু। তিনি ফুলের মালা প্রতীক নিয়ে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

মুন্সীগঞ্জ-২ : আসনে বি. চৌধুরী নমিনেশন প্রত্যাহার করায় বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান সিন্হার জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে। বি. চৌধুরী নির্বাচন করলে বিএনপি বলয়ের ভোট কাটা পড়ার সম্ভাবনা ছিল। সে আশঙ্কা এখন আর নেই। তবে বি. চৌধুরীর এ সিদ্ধান্তে দলীয় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা জানান, দলীয় নেতাকর্মীদের না জানিয়ে বি. চৌধুরীর এভাবে প্রস্খান করা কোনোভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না। অনেকে আবার বিষয়টি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান সিন্হার সাথে তার গোপন সমঝোতা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মিজানুর রহমান সিন্হার ভোটব্যাংক রয়েছে। সেই ভোটব্যাংকের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস পেয়েই এ মনোনয়ন প্রত্যাহার বলে তারা মনে করছেন। ’৭৫ পরবর্তী কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এ আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ছিল ক্ষমতায়। দ্বিতীয়বারের মতো এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন- মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ সংক্ষরিত আসনের সাবেক এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মিজানুর রহমান সিন্হার কাছে হেরে যান। নবম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দু’দলের প্রার্থীই ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং উপজেলা নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-২ আসন গঠিত হয়েছে। ফলে সীমানা বেড়েছে। তাই নতুন নতুন এলাকায় গণসংযোগ ও মিটিং মিছিল শুরু হয়েছে। এ ছাড়া এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলহাজ আব্দুস সাত্তার মোল্লা হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করছেন।

মুন্সীগঞ্জ-৩ : এ আসনে জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান লাঙ্গল প্রতীকে ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এম ইদ্রিস আলী নৌকা প্রতীকে নির্বাচনী মাঠে থাকায় মহাজোটের প্রার্থী নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মহাজোটের প্রার্থী দাবি করে বলেন, একটি কনফিউশন সৃষ্টি করা হয়েছে প্রার্থিতা নিয়ে। আমি মহাজোটের প্রার্থী। স্বার্থান্বেষী মহলবিশেষ সুবিধার জন্য এসব করছে। এটা মহাজোটকে ক্ষতি করার অপচেষ্টা। নতুন মুখ সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব এম ইদ্রিস আলী বলেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে আমি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। এ আসনে চারদলীয় জোট প্রার্থী এম শামসুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বিএনপি আমলে সারাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে ছিল। তাই আমরা আশাবাদী। নির্বাচন নিয়ে একটু শঙ্কা জনগণের আছে, তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তা কেটে যাবে। এ ছাড়া এ আসনে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মো: ইব্রাহীম বেপারী (ফুলের মালা), জাতীয় পার্টি জেপি’র নাজমুন নাহার বেবী (বাইসাইকেল), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল থেকে মিল্টন হোসেন (তারা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ওমর ফারুক লিটন (হাতপাখা), ইসলামী ফন্সন্ট বাংলাদেশের লিয়াকত আলী খান (চেয়ার), পিডিপি’র মো: নূরুল ইসলাম (কুলা) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির শেখ কামাল হোসেন কাস্তে মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছেন।

প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব যা-ই থাকুক না কেন সাধারণ ভোটাররা সবাই এখন চেয়ে আছেন নির্বাচনের দিকে। তাদের একটিই আশা আগামী দিনের নির্বাচিত সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসবে। দুু’বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত খাওয়া যাবে।

[ad#co-1]