নির্বাচনে কোনও পক্ষপাতের অবকাশ নেই: ফখরুদ্দীন

ঢাকা, ডিসেম্বর ২১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- নির্বাচনে কোনও ধরনের পক্ষপাত হবে না জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ বলেছেন, কারও প্রতি পক্ষপাত বা কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার করার অবকাশ নেই।

রোববার সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

নির্বাচনে কোনও ধরনের অনিয়ম কিংবা দায়িত্বে অবহেলা মেনে নেওয়া হবে না বলেও কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ার করেছেন প্রধান উপদেষ্টা।

২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন ‘জাতীয় জীবনের এক কঠিন পরীক্ষা’ অভিহিত করে তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া সুচারুরূপে শেষ করতে কর্মকর্তাদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওই সভায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন।

প্রধান উপদেষ্টা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “সব প্রকার ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, কারও প্রতি কোনও প্রকার পক্ষপাত, কোনও রূপ প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করার কোনও অবকাশ নেই।”

কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে ফখরুদ্দীন আহমদ বলেন, “নির্বাচনী দায়িত্ব ও কর্তব্য কাজে কোনও প্রকার জালিয়াতি, কারচুপি বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।”

এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নিরপেক্ষ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ থাকবে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কোনও অপচেষ্টার জন্য অত্যন্ত চড়ামূল্য দিতে হবে।

আগামী ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “রাজধানী ঢাকা দেশের প্রাণকেন্দ্র। ঘনবসতি ঢাকার প্রতিটি কেন্দ্রের নিরাপত্তার ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।”

বিদেশে পালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসীরা ঢাকা বিভাগের সীমান্তবর্তী ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুর জেলা দিয়ে যেন ঢুকতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দেন তিনি।

একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ যাতে দেশে ঢুকতে না পারে, সে জন্য সীমান্তবর্তী থানা পুলিশ, বিডিআরসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চরমপন্থী ও নিষিদ্ধ সংগঠনসহ অন্য কোনও অপশক্তি যাতে নির্বাচনের সময় কোনও অপতৎপরতা চালাতে না পারে সেদিকে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে হবে।
ভাওয়াল ও মধুপুর গড়সহ ঢাকা বিভাগের দুর্গম এলাআর জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।

সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এমএ মতিন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. আব্দুল আজিজ, স্বরাষ্ট্র সচিব মো. আব্দুল করিম বক্তব্য রাখেন। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার আজিজ হাসান, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার নাইম আহমেদসহ ছয় জন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মতিন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেন।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে ফিরে আত্মগোপন করে করে থাকতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তারা সময়মতো মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। এ জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

মন্ত্রিপরিষদ সচিব আব্দুল আজিজ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে বলেন, “বিদেশি ও দেশি পর্যবেক্ষকরা যাতে আচরণ বিধিমালা মেনে চলে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্বাচনে তাদেরও একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।”

স্বরাষ্ট্র সচিব আব্দুল করিম সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “অতীতে বাগেরহাট, বরিশাল, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন হয়েছে। আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।”

কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘলাইন সামাল দিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে বুথের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রাখার প্রস্তাব করেন ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ।

বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্য শোনার পর প্রধান উপদেষ্টা দ্বিতীয় দফা বক্তব্য রাখেন।

তিনি বলেন, “নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, উপজাতীয়, প্রতিবন্ধী, দুর্বল ও বৃদ্ধ ভোটারদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপারে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু এবং দুর্বলদের ওপর আক্রমণ ও হামলার বিষয়টির ওপর লক্ষ্য রাখবেন। এ ক্ষেত্রে অতীত ঘটনাবলির রেকর্ড অনুসারে আগাম ব্যবস্থা নেবেন।”

ভোটগ্রহণ দ্রুত করার ওপর জোর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “স্বাভাবিক হারের চেয়ে ধীরগতিতে ভোটগ্রহণ দীর্ঘলাইন সৃষ্টি করে ভোটারদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়। যা শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘে�র কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

“পরিস্থিতি বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে বুথের সংখ্যা কিভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আগে থেকেই নিতে হবে।”

ফখরুদ্দীন আহমদ বলেন, “নির্বাচনকালে স্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ভোট গ্রহণ, সঠিক লাইন ব্যবস্থাপনা, ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ ও নির্বিঘে� আগমন, সঠিক ও নির্ভুল ভোট গণনা, পোলিং এজেন্টদের আস্থা অর্জন- প্রতিটি কাজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঠিক ও প্রয়োগিক জ্ঞান, সদিচ্ছা ও সততা অত্যন্ত জরুরি।

“আগামী কয়েকটি দিন জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে পরিপূর্ণ সাফল্য লাভ করবেন। জনগণের মতামতের একশভাগ প্রতিফলন ঘটে এমন একটি স্বচ্ছ, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবেন।”

“জাতীয় জীবনের এই কঠিন পরীক্ষায় আপনাদের উত্তীর্ণ হতেই হবে।”

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি বারবার বলেছি, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারে মূল লক্ষ্য। আমরা আজ সেই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছেই পৌঁছে গেছি।

“বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে আমাদের সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে আপনাদের সম্পূর্ণ সততা, নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে।”

সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমার বিশ্বাস, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও সংস্কার, ছবিযুক্ত নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের সংশোধন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০০৮ জারি, প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা মাপকাঠি শক্তিশালীকরণ, হলফনামাসহ বিভিন্ন তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন প্রভৃতি কর্মসূচি ও সংস্কার নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে।

“সৎ, নিষ্ঠাবান, যোগ্য ও জনদরদী জনপ্রতিনিধি চয়নে ভোটাররাও অনেক বেশি সচেতন ও সজাগ হয়েছেন। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচারণা ও জনমত সৃষ্টি প্রশংসার দাবি রাখে। গণতান্ত্রিক উত্তরণে এ সব কার্যক্রম ব্যাপক অবদান রাখছে বলে মনে করি।”

ভোটের দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এবং অগ্নি পরীক্ষার দিন হিসেবে অভিহিত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ও বুথগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং অফিসারদের কর্মতৎপরতা, সততা ও দক্ষতা-শান্তিপূর্ণ ও ভালো ভোটের অন্যতম চাবিকাঠি।”

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ভোটারদের প্রতি সদয়, সুন্দর ও মার্জিত আচরণ সুনিশ্চিত করলে দেখবেন কোনও প্রকার উৎকণ্ঠা ছাড়া সুন্দরভাবে ভোট গ্রহণ হবে।”

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও সহিংস ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগেই নিয়ে রাখার নির্দেশ দেন ফখরুদ্দীন।

মতবিনিময় সভায় ঢাকার ১৭ জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ১২১ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় দুশ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/ইএইচবি/এডি/এমআই/১৮৩০ ঘ.