স্বাধীনতা ভুলে যাওয়ার নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সমষ্টির স্বার্থ এবং ব্যক্তির স্বার্থ দু’টি আলাদা বস্তু, তাদের ভেতর পার্থক্য তো খুবই স্পস্ট, কিন্তু দু’য়ের ভেতর ঝগড়া-ফ্যাসাদ যে একেবারে অনিবার্য তা বলা যাবে না। কেননা সমষ্টির স্বার্থের পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয় ব্যক্তির স্বার্থকে পুষ্ট করা, নদী যেমন সমৃদ্ধ করে তার শাখা-প্রশাখাকে। তেমনি আবার ব্যক্তিও পারে সমষ্টির প্রবাহকে পূর্ণ ও বেগবান করতে, এবং সেই পথে নিজেকে আরো ধনী করে তুলতো কিন্তু ব্যক্তি ও সমষ্টিতে শত্রুতা বাধে বৈকি। সমষ্টির মধ্যে যে ব্যক্তি রয়েছে, ব্যক্তি যে মোটেই এগুবে না সমষ্টি যদি পেছন থেকে তাকে টেনে ধরে, আঁকড়ে রাখে পথ এই সত্যটিকে অনেক সময়েই দূরবর্তী তত্ত্ব মনে হয়, বিশেষ করে তখন যখন নিজেকে বাঁচানোটা প্রয়োজন হয়ে পড়ে, অন্যসবকিছুর আগে। নিজে পানিতে পড়লে প্রতিবেশীর কথা কে ভাবে?

তা আমরা কি পানিতে পড়েছি? না, তা নয়; দুর্দশাটা ওই মাত্রার নয়। তবে পানিতে পড়েছিলাম বৈকি; পড়েছিলাম একাত্তরে। তখন আমরা সকলেই বিপদে পড়েছিলাম। বিপদ মানেই মানুষকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে, আলাদা করে দেয়। প্রত্যেকে তখন নিজের কথা ভাবে। একাত্তরে আমরা নিজের কথা ভেবেছি; কিন্তু ভাবতে গিয়ে সকলের কথাও ভেবেছি। কেননা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যেও সজাগ ছিল এই উপলব্ধি যে, সকলে বাঁচলে তবেই আমরা প্রত্যেকে বাঁচবো, নইলে নয়। কেননা, যে-শত্রু আমাদেরকে আক্রমণ করেছিল সে কারো ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না; তার শত্রুতাটা ছিল আমাদের সকলের সাথে। তাই সবাই মিলে তাকে পরাভূত করা অত্যাবশ্যক মনে হয়েছিল, বাঁচার স্বার্থে। শত্রু টিকে থাকলে আমরা টিকবো না, এটা বুঝেছিলাম। যারা নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বাঁচার চেষ্টা করেছে তারা কোনো না কোনো পরিমাণে রাজাকারে পরিণত হয়েছে। হয়তো বা না -জেনেই। হানাদারদের তোয়াজ করে।

বাস্তবতা বলছে যে, এখনো আমরা বিপদেই আছি, তবে তখনকার মতো একেবারে পানিতে পড়েছি বলে মনে হচ্ছে না। বাস্তবতা এটা যে, একটি সাধারণ শত্রু আমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে আছে। এ আমাদেরকে বাঁচার মতো করে বাঁচতে দেবে না। যারা টিকবে তারা যতই বিলাস, কিম্বা দম্ভ করুক, টিকে থাকবে আপোস করে, একটি বিশ্বব্যবস্থার অংশ হয়ে গিয়ে। ওই রাজাকারই আসলে; নতুন নামে। এদের হৈ হৈ রৈ রৈটা স্রোতে ভাসমান আত্মসমর্পণকারীদের আস্ফালন ছাড়া অন্য কিছু নয়।

স্রোতটা হচ্ছে বিশ্ব পুঁজিবাদের। রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি যার অধীনে চলে গেছে। যেমন অর্থনৈতিক- ভাবে, তেমনি আদর্শগত রূপে। পুঁজিবাদ ব্যক্তিকে চেনে, সমষ্টিকে চেনে না, ব্যক্তির স্বার্থ ও লক্ষ্যকে সে দাঁড় করিয়ে দেয় সমষ্টির স্বার্থ ও লক্ষ্যের বিরুদ্ধে। একাত্তরে আমরা সমষ্টিগতভাবে লড়েছিলাম; সে লড়াইয়ে আপাত বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের পরাজয়ের সূত্রপাত ঘটেছে। আমরা বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছি। সাধারণ শত্রুকে ভুলে পরস্পরকে একে অপরের শত্রুতে পরিণত করেছি। ফলে প্রকৃত অর্থে উন্নত হচ্ছি না, এগুতেও পারছি না। মুক্তির যে লক্ষ্যটা সামনে ছিল সেটাকে ভুলে গেছি এবং পুঁজিবাদ তার নিজের স্বার্থ ও প্রবণতায় সেটা ভুলিয়েও দিয়েছে।

একাত্তরের যুদ্ধ সশস্ত্র ছিল। অস্ত্র হাতে মানুষ লড়েছে। কিন্তু তার আসল চরিত্র ছিল আদর্শিক; দু’টি আদর্শ পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল। একটি আদর্শ লুণ্ঠনের, অপরটি লুণ্ঠনকে প্রতিহত করে সার্বজনীন মুক্তি অর্জনের। ওই যুদ্ধ হঠাৎ শুরু হয়নি, বিশেষ কোনো দিনে কিম্বা ঘটনার মধ্য দিয়ে তার সূত্রপাত ঘটেনি। তার একটি নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, আছে ধারাবাহিকতা। পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, আছে তে-ভাগা আন্দোলন, তারও আগের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনও। ধারাবাহিকভাবে এগুতে এগুতে একটি পর্যায়ে এসে বিস্ফোরণ ঘটেছে একাত্তরে।

বিস্ফোরণটা অনেক বড় ছিল নেতৃত্বের তুলনায়। নেতৃত্ব তাই সঠিক পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেনি। পেছনের লোক এগিয়ে গেছেন সম্মুখবর্তীদেরকে পেছনে ফেলে। একাত্তরের ঐক্যটা জনগণের ঐক্য, নেতৃত্বের ঐক্য নয়। রণাঙ্গনে সাধারণ মানুষ ছিল, যাদের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না যুদ্ধের। নেতৃত্বের ভেতর কোন্দল দেখা গেছে, ষড়যন্ত্র যে অনুপস্থিত ছিল তাও নয়। মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি মুজিববাহিনী গড়ে উঠেছে, মুক্তিবাহিনীতে বামপন্থীদেরকে নেয়া হয়নি; অনেকক্ষেত্রে বামপন্থীরা নিজেরাও ছিল বিভ্রান্ত। তবুও, সব মিলিয়ে, মূল স্রোতটা ছিল আদর্শবাদী। ওই আদর্শবাদ পুরাতন।

আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ভেঙে তার জায়গায় ছোট কিন্তু অন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি, স্বপ্ন দেখেছে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যেখানে মানুষ মুক্তি পাবে এবং মুক্তির জন্য অত্যাবশ্যকীয় যে বৈষম্যহীন সমাজ তা গড়ে উঠবে। এ ছিল জনগণের আকাঙক্ষা, নেতৃত্বের নয়। নেতৃত্ব চেয়েছে পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত আসনগুলোতে তারা আরাম করে বসে পড়বে। একদিন যেমন ব্রিটিশের পরিত্যক্ত গদিগুলোতে তাদের পূর্বসূরিরা বসেছিল। নেতৃত্বের আদর্শবাদ ব্যক্তিস্বার্থের, জনগণের আদর্শবাদ সমষ্টিস্বার্থের। দুটোই এগুচ্ছিল নিজস্ব ধারাবাহিকতায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্যক্তিস্বার্থই জয়যুক্ত হয়েছে, সমষ্টিস্বার্থকে পদদলিত করে।

মস্ত বড় জয়ের পরে এটা একটা মস্ত বড় পরাজয়। দু’টোই ঐতিহাসিক। হানাদারেরা পরাভূত হলো, তারা তাদের হাতের অস্ত্র সমর্পণ করলো, কিন্তু তাদের আদর্শ অপরাজিতই রয়ে গেলো। বিজয়ী বীরেরা ওই আদর্শকেই নিজেদের মধ্যে মহোৎসাহে ও প্রায় অবাধে বিকশিত করতে থাকলো। সাধারণ মানুষ দেখলো তারা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়েছে, বিদেশী হানাদারদেরকে তারা বিতাড়িত করেছে ঠিকই, কিন্তু স্বদেশী লুণ্ঠনকারীদের কবলে পড়ে গেছে। লুণ্ঠনই আদর্শ হয়ে দাঁড়ালো।

ফলে মানুষ দ্বিতীয় দফায় নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়লেন। বিদেশী হানাদারদের বিরুদ্ধে যে সমষ্টিগত লড়াইটা ছিল, সেটি এখন আর নেই। এখনকার যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত। পাকিস্তানীবাহিনী চলে গেছে, কিন্তু রক্ষীবাহিনী বসে থাকেনি। তারপরে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটলো। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের যিনি প্রধান তিনি সপরিবারে নিহত হলেন এবং তারপর একের পর এক সামরিক বাহিনীর লোকদের অধীনে চলে গেল বাংলাদেশ। ক্রমাগত বৈষম্য বাড়তে থাকলো এবং কমতে থাকলো দেশপ্রেম। নিঃশব্দে টাকার শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। আর টাকা চলে গেলো যত লুণ্ঠনকারী ও ঋণখেলাপী, দুর্নীতিবাজ, আমলা ও রাজনীতিক এবং বিদেশি কোম্পানি ও সংস্থার স্থানীয় এজেন্টদের হাতে। কমতে থাকলো নিরাপত্তা। বিশেষভাবে বিপদ ঘটলো সমাজের দুর্বল অংশের, যেমন দরিদ্রের, নারীর, সংখ্যালঘুর এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার।

যুদ্ধের সময়ে মানুষ ব্যস্ত ছিল কাজে। যুদ্ধ নিজেই একটা সার্বক্ষণিক কাজ। কাজ চলছিল, রণাঙ্গনে, চলছিল কৃষিতে। আর আশা ছিল যে, দেশ স্বাধীন হলে কর্মের বিপুল সুযোগ তৈরি হবে। মানুষ বেকার থাকবে না। শিল্পায়ন ঘটবে। উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদকেরা মর্যাদাবান হবে। সেই আশা পূরণ হয়নি। বিনিয়োগ ঘটেনি। যারা উৎপাদন করে তারা দরিদ্র হয়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়নি। সামরিক-বেসামরিক অনুৎপাদক খাতগুলোতে খরচ বেড়েছে। অপচয় মাত্রাহীন হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি রাষ্ট্র ক্ষমতা চলে গেলে তাদের হাতে যারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নয়। কর্মের ক্ষেত্রকে প্রসারিত না করে বরঞ্চ সংকুচিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ সমষ্টিগত মুক্তির যে লক্ষ্যকে সামনে তুলে ধরেছিল, সেটা আলস্যের নয়, কাজের; সেটা ব্যক্তিগত লুণ্ঠনের নয়, সমষ্টিগত সৃষ্টির। সেই আদর্শ জয়যুক্ত হয়েছে এমনটা বলা যাচ্ছে না, যদিও আমরা বলি, ভালোবাসি বলতে, যে মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি।

সর্বত্র চলছে ব্যক্তিস্বার্থের জয়-জয়কার। সামাজিক সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাচ্ছে। নদী, বিল, খাল, হাওর, পার্ক সব লুণ্ঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কল-কারখানা প্রথমে দলীয় লোকদের দখলে চলে গেছিল, পরে অরুগ্ন অবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানায় নামমাত্র দামে তুলে দেওয়া হয়েছে; এবং ওই নতুন মালিকেরা কারখানা চালায়নি, কারখানার জমি, ঘরবাড়ি, যন্ত্রপাতি সব বেচে দিয়েছে কিংবা অন্য কাজে লাগিয়েছে, ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে কি আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। লুটপাটকারীরা নিজেদের মধ্যে কামড়া-কামড়ি করছে, বিশেষ প্রাণীদের মতো থেকে-থেকে ধ্বনি তুলছে, নানাবিধ। এই দুর্বৃত্তদের কাছ থেকে তাদের অনুসরণকারীরা যা শিখছে তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা লক্ষ্যের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। একাত্তরে এদের কেউ কেউ যে যুদ্ধে গিয়েছিল এটা সত্য, কিন্তু যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল বলেই মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হয়েছিল তা নয়; এবং পরবর্তীতে তাদের কারো কারো অবস্থান হানাদারদের কাণ্ড-কারখানা থেকে পরিমাণগতভাবে দূরবর্তী হয়তো ছিল, কিন্তু গুণগত মানে অনেক দূরের ছিল না। এখনো নেই। মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু যুদ্ধের পরে দেখা যাচ্ছে অবিকল তাই ঘটেছে। ব্যক্তি নিজেকে কেবল বিচ্ছিন্ন নয়, সর্বপ্রধান করে তুলেছে, সমষ্টিকে যতটা পারা যায় লাঞ্ছিত করে। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি যুদ্ধের ওপর বই লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, পড়লে মনে হয় যুদ্ধটা ছিল তারই যুদ্ধ, ব্যক্তিগত এবং যুদ্ধটা প্রমাণ করেছে তার মধ্যে কতটা মহত্ত্ব, বীরত্ব ইত্যাদি লুক্কায়িত ছিল। প্রচন্ড মুনাফা-লোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুমুল ভোগস্পৃহা। ভোগের এক অত্যাশ্চর্য প্লাবন বয়ে চলেছে দুর্দশাগ্রস্ত এই দেশের ওপর দিয়ে। সেখানেও প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা একের সঙ্গে অন্য সকলের।

এই পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধূসর হতে বাধ্য। স্মৃতি বিশেষভাবে তারাই ধরে রাখছে যারা এ নিয়ে ব্যবসা করতে পারে। আর মনে রাখতে বাধ্য হচ্ছে তারা যারা আপনজনকে হারিয়েছে। যারা লাঞ্ছিত হয়েছে নানাভাবে। এদের মধ্যে সম্পন্ন মানুষরাও আছে, আছে বলেই তবু থেকে থেকে যুদ্ধের উল্লেখ ঘটে, কেবল সাধারণ মানুষের দুঃখের ব্যাপার হলে চাপা পড়ে যেত বিস্মৃতির আরো অনেক গভীরে।

মুক্তিযুদ্ধের ভেতরকার অঙ্গীকারটা তো অবশ্যই ছিল সমষ্টিগতভাবে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার। এ যুদ্ধ তো অন্যে লড়ে দেবে না। নিজেকেই লড়তে হয়, নিজের ওপর নির্ভর করে। অন্যরা সাহায্য করবে, অবশ্যই; কিন্তু তাদের ওপর ভর করে লড়াই করা যাবে এরকমের আশ্চর্য কথা কেউ কখনো শুনেছে বলে মনে হয় না। অন্যে এসে যদি মুক্ত করে দেয় তবে তার অর্থ তো স্বাধীনতা হতে পারে না, পরাধীনতাই হবার কথা। আমাদের যুদ্ধে যে-মধ্যবিত্ত শ্রেণী নেতৃত্ব দিয়েছে তার ভিত্তিটাই ছিল পরাশ্রয়ী; এই শ্রেণী স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠেনি অন্যকে জড়িয়ে ধরে কোনমতে বিকশিত হয়েছে। সে প্রভু বদল করতে পারে, কিন্তু স্বাধীন হতে ভয় পায়। একাত্তরের যুদ্ধে তাই আমরা, নেতৃত্বদানকারী মধ্যবিত্তরা, কান পেতে থেকেছি কোথায় কার সমর্থন পাওয়া গেলো সেটা শোনার জন্য। অনুমোদনের সামান্য সামান্য শব্দ শোনামাত্র উৎফুল্ল হয়েছি, যেমন মুহ্যমান হয়েছি বিরোধিতার ধ্বনি কানে এলে। ভারত কেন স্বীকৃতি দিচ্ছে না এ ছিল সার্বক্ষণিক গুন-গুন, ভারতীয় বাহিনী কেন ত্বরায় প্রবেশ করছে না সীমান্ত পার হয়ে এ নিয়ে কেবল জিজ্ঞাসা ছিল না, ছিল গভীর উদ্বেগ। পাকিস্তান খুশি হতো যুদ্ধটাকে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারলে; প্রকারান্তে আমরাও যেন তেমনটাই চাইছিলাম। শ্রেণীগতভাবে মধ্যবিত্তের আস্থা ছিল না সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত একটি দুর্ধর্ষ বাহিনীকে ভীরু বাঙালী পর্যুদস্ত করতে পারবে। নিজের পরাশ্রয়-প্রবণতার কারণেই ওই আস্থাটা তৈরি হতে পারেনি, কঠিন ছিল তৈরি হওয়া। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানীরা যখন আত্মসমর্পণ করলো তখন তারা ভারতীয় সেনাপতির কাছেই মাথা ও গোঁফ নোয়ালো; আমাদের সেনাপ্রধানের পক্ষে সেখানে উপস্থিত থাকা সম্ভব হলো না। ঘটনাটি তাৎক্ষণিত বটে, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য মোটেই ছোট নয়। বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের পক্ষে যতটা বড় হবার কথা ছিল ততটা বড় আমরা হতে পারলাম না।

তবু আত্মমর্যাদা বেড়েছিল বৈকি। আমরা জিতেছি, আমাদের ভূমিতেই হানাদারেরা আত্মসমর্পণ করেছে, প্রবাসী সরকার দেশে ফিরে এসেছে, এসে দেশ শাসনের দায়িত্বভার হাতে নিয়েছে। নতুন সংবিধান তৈরি হলো। বিশ্ব আমাদেরকে দেখলো, খুশি হলো। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলো, বাংলাদেশের পতাকা দেশে-বিদেশে উড্ডীন হতে দেখলাম। আমরা বললাম, আমরা একটি গর্বিত জাতি।

কিন্তু তারপর? তারপরের ইতিহাস তো ক্রমাগত পিছু হাঁটার। আদর্শবাদটা চলে গেছে, যার কথা ওপরে উল্লেখ করছি। ওই আদর্শবাদের অন্তর্ধানের ফলে মুক্তিযুদ্ধ অনেকের চোখেই নিছক ‘গোলমাল’ ভিন্ন বড় কিছু নয়; তাদের দৃষ্টিতে একাত্তরে একটা গোলমাল বেধেছিল, আমরা কষ্টে পড়েছিলাম, কপাল ভালো, সেটা চলে গেছে, এখন মোটামুটি ভালোই আছি, যতটা থাকা যায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শবাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল আত্মনির্ভরশীল হবার আকাঙক্ষাটাও। পাকিস্তানীদের হটিয়ে দিয়ে আমরা অন্য কাউকে ডেকে আনবো এমন কোনো কথা ছিল না, থাকলে ওই যুদ্ধ মুক্তির যুদ্ধ বলে কিছুতেই দাবি করতে পারবো না। কিন্তু দেখা গেল ডাকাডাকি ঠিকই শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয়রা তো আসবেই, তারা আমাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্র। কিন্তু পাকিস্তানীরাও চলে এলো। আমরাই ডেকে আনলাম। ভুট্টো এসে ঢাকা ঘুরে গেলো, সসম্মানে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো না, পাকিস্তান ক্ষমা চাইলো না, আটকে পড়া পাকিস্তানীদেরকে তারা ফিরিয়েও নিলো না।

ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আমরা ছুটলাম দ্বারে দ্বারে। দান, অনুদান, ঋণ আসতে শুরু করলো। যত এলো ততই আমরা নত হলাম। কিন্তু স্ফীত হলো শাসক শ্রেণী। এখন ঋণ নিতে নিতে এমন দশা হয়েছে দেশের যে ঋণ ছাড়া আমরা যে চলতে পারবো এটা কল্পনা করাও কঠিন মনে হয়। দেশের যারা শাসক তারা আসলে ভক্ষক, যদিও তাদের ছদ্মবেশটা রক্ষকের। এরা দেশকে বন্ধক রাখতে চায় পুঁজিবাদী বিশ্বের কাছে, জনগণের মঙ্গল হবে বলে নয়, নিজেদের পকেট ভারী হবে, এই আশায়। দারিদ্র্য বিক্রি শেষ হয়েছে, এখন সম্পদ যা আছে তা বিক্রির তাল তুলেছে, এরা এমনই আপোসবিহীন জাতীয়তাবাদী। আসলে হানাদারই, নতুন নামে।

আমরা আদর্শ ভুলেছি এবং আমাদেরকে আদর্শ ভুলতে প্ররোচনাও দেয়া হয়েছে। দিয়েছে ওই পুঁজিবাদী বিশ্বই। ওই বিশ্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না। যুদ্ধের সময় সরাসরি বিরোধিতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুতা করেছে। তারপরেও শত্রুতা অব্যাহত রেখেছে। আমরা বলি শত্রুতা, ওরা বলে নিজেদের অধীনে রাখা। এই ক্ষমতার একটা দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক, অন্যটি আদর্শিক। আদর্শিক দিকটাও সামান্য নয়।

যে-নামেই ডাকি, স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে অধিকার ও সুযোগের বৈষম্য থাকবে না। মানুষের সমষ্টিগত স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ এক সঙ্গে গ্রথিত হয়ে যাবে, সমষ্টি ব্যক্তিকে সাহায্য করবে, ব্যক্তি পুষ্ট করবে সমষ্টিকে, যে-পুষ্টি আবার ব্যক্তির কাছেই ফিরে আসবে সম্পদ হয়ে, মৈত্রীর ভেতর দিয়ে, সম্মান বয়ে নিয়ে। ওটা যেমন ছিল আদর্শ, তেমনি ছিল লক্ষ্য; ওই লক্ষ্য ভুলবার প্ররোচনাও পুঁজিবাদী বিশ্বই আমাদেরকে অবিরাম দিচ্ছে। বলছে স্বার্থপর হতে, নিজেরটা দেখতে। পরামর্শ দিচ্ছে বড় হও, নিজের চরকায় তেল দিতে থাকো, অন্যরা অন্যদেরটা দেখবে। শেখাচ্ছে তাদের ওপর নির্ভরশীল হতে। বিচ্ছিন্ন করছে সমষ্টি থেকে এবং আপনজন থেকেও। এটাও একটা আদর্শ বটে, তবে এ ততটা মানবিক নয়, যতটা জংলী। জঙ্গলে সেই টেকে যার শক্তি আছে; আধুনিক সমাজের সকল আভা ও আবরণ সত্ত্বেও পুঁজিবাদী বাস্তবটা ওই রকমই।

আত্মসুখ ও মুনাফা সন্ধানের এই আদর্শবাদ যত প্রচার পাচ্ছে ও গৃহীত হচ্ছে ততই আমরা আমাদের সমষ্টিগত অগ্রগতির লক্ষ্যটাকে ভুলে যাচ্ছি। প্রচার মাধ্যমগুলো তথ্য এবং আনন্দ বিতরণের ভেতর দিয়ে ওই আদর্শবাদ অহর্নিশ প্রচার করছে। প্রচার নয়, সংক্রমিত করে দিচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতরে। আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণহীন আত্মসচেতন অর্থাৎ ভোগ-সচেতন প্রাণীতে পরিণত হচ্ছি।

বাঁচবার উপায় হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। মুক্তির যে-আকাঙক্ষা আমাদেরকে পরিচালিত করেছিল সেই আদর্শবাদকে নিজেদের মধ্যে পুনরুজ্জীবিত করা। এ কাজে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য হবার কথা। আবশ্যকতাটি তাঁরা বুঝবেন এবং বুঝে জনগণকে এ-বিষয়ে সচেতন করে তুলবেন, এটা প্রত্যাশিত। ওই সচেতনতা নতুন ঐক্যের জন্ম দেবে, অথবা বলা যায় পুরাতন ঐক্যকেই ফিরিয়ে আনবে। আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে ছিটকে পড়বো না, মুক্তির সংগ্রামটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবো। নিজের স্বার্থেই সকলের স্বার্থকে দেখতে হবে, দাঁড়াবার জায়গা না থাকলে আমরা কেউ দাঁড়াতে পারবো না, সম্মান ও সমৃদ্ধি অর্জনের তো প্রশ্নই ওঠে না।