মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী

manikমাহমুদুল বাসার
ত্রিশের কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়। কিন্তু ত্রিশের কবিদের থেকে আলাদা। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, আপাদমস্তক বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন, বাস্তববাদী ছিলেন। তবে সর্বোপরি অতুলনীয় শিল্পী ছিলেন, না হলে কী মূল্য ছিল তার? ‘আত্মনিবেদিত প্রাণশিল্পী’ হিসেবেই মানিক বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসেই তিনি তার শিল্প ক্ষমতার, শিল্প সার্থকতার চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছেন। বিদ্বানরা মন্তব্য করেছেন, পৃথিবীর হাতে তুলে দেয়ার মতো উপন্যাস।

৩ ডিসেম্বর, বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৫৬ সালের এই দিনে তিনি অকাল মৃত্যুবরণ করেন। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯০৮ সালের ১৯ মে। পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়। মায়ের নাম নীরদা সুন্দরী দেবী। মানিক পিতার পঞ্চম পুত্র। মানিকের আদিনিবাস ঢাকার বিক্রমপুর, মালবদিয়া গ্রামে। গ্রামটি পদ্মা নদীর পাড়ে অবস্থিত। পদ্মার পাড়ে গাওদিয়া তার মামাবাড়ি। তার সবচেয়ে বিখ্যাত দুটো উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এবং ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য় যেমন গাওদিয়া তেমনি পদ্মাপাড়ের গ্রাম জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন।
মাত্র ৪৮ বছর বেঁচেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্যে অসাধ্য সাধন করে গেছেন তিনি। ৩৯টি উপন্যাস লিখেছেন, ১৬টি গল্পগ্রন্থ, একটি প্রবন্ধের বই, নাম ‘লেখকের কথা’ একটি নাটক, একটি কবিতার সঙ্কলন রেখে গেছেন। আছে ডায়রি, চিঠিপত্র, অগ্রন্থিত গল্প।
আবুল ফজল বলেছেন, ‘তার রচনার বহর দেখে সহজেই অনুমান করা যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী ও সাহিত্যকর্মে একান্তভাবে আত্মনিবেদিত প্রাণশিল্পী।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবুল ফজলের মতো এতো লাগসইভাবে আর কেউ চিহ্নিত করতে পারেননি, ‘আত্মনিবেদিত প্রাণশিল্প’। আমরা তো মতবাদী না বানাতে পারলে মোটে স্বস্তি পাই না।
লেখার নিষ্ঠা সম্পর্কে ‘কেন লিখি’ প্রবন্ধে মানিক বলেছেন, ‘লেখক নিছক কলম পেষা মজুর। কলম পেষা যদি তার কাজে না লাগে তবে রাস্তার ধারে বসে যে, মজুর খোয়া ভাঙে তার চেয়েও জীবন তার ব্যর্থ, বেঁচে থাকা নিরর্থক।
কলম পেষার পেশা বেছে নিয়ে প্রশংসায় আনন্দ পাই বলে দুঃখ নেই, এখনো মাঝে মধ্যে অন্যমনস্কতার দুর্বল মুহূর্তে অহংকার বোধকরি বলে আফসোস আগে যে, খাঁটি লেখক কবে হবো।’
আমরা যারা লেখক হবার স্বপ্ন দেখি, তাদের মানিকের কথাটুকু ধাক্কা না পেরে পারবে না।
শুধু লিখতে গিয়ে, লেখার আদর্শ রক্ষা করতে গিয়ে মানিক আমৃত্যু প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। দারিদ্র্য মোকাবেলা করেছেন, রক্তকণিকার মধ্যে হতাশার মারণবিষ ধারণ করেছেন। মাইকেল, নজরুল, সুকান্তের পরিণতি প্রায় একই রকম : ডাহা অকাল মৃত্যু। কোথায় যেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রকৃতিও আমাদের প্রতি বৈরী, আমাদের প্রগতিশীলদের কেড়ে নিয়ে যায়।’
ত্রিশের কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়। কিন্তু ত্রিশের কবিদের থেকে আলাদা। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, আপাদমস্তক বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন, বাস্তববাদী ছিলেন। তবে সর্বোপরি অতুলনীয় শিল্পী ছিলেন, না হলে কী মূল্য ছিল তার? ‘আত্মনিবেদিত প্রাণশিল্পী’ হিসেবেই মানিক বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসেই তিনি তার শিল্প ক্ষমতার, শিল্প সার্থকতার চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছেন। বিদ্বানরা মন্তব্য করেছেন, পৃথিবীর হাতে তুলে দেয়ার মতো উপন্যাস।
এ উপন্যাসে মানিক বিজ্ঞানীর চোখ দিয়ে সমাজের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করেছেন। মননশীল কথাশিল্পীর ধারালো চোখ দিয়ে সমাজলগ্ন মানুষের বহিরঙ্গ এবং অন্তরঙ্গ বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। ভাবের ফানুস দিয়ে, কৃত্রিম কল্পনা দিয়ে অসার অসাধারণ করে তোলেননি।
কুবের ও কপিলার মতো, হোসেন মিয়ার মতো চরিত্র বাংলা উপন্যাসে আর কে-ই বা সৃষ্টি করতে পেরেছেন? এমনকি ক্ষুদ্র পার্শ্বচরিত্রটিও ভেতরগত বাস্তবাশ্রয়ী করে ফুটিয়ে তুলেছেন। নিরাবেগ, টান টান দৃষ্টিতে মানুষের অসহায়তা, নিয়তি, দারিদ্র্য, শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, বৈষম্য, লোভ লালসা, দয়া-মায়া, সহানুভূতি, প্রেম-বিরহের চিত্র ফুটিয়েছেন।
মানিকের একজন গাঢ় অনুরাগী হিসেবে আমি সূক্ষ্ম নজরে খেয়াল করছি, মানিক তার অনেক বিখ্যাত উপন্যাসে সমানভাবে মুসলমান চরিত্র-গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এঁকেছেন। অনেকের মধ্যে তা দেখা যায় না। এখনো যারা মানিকবন্দনা করেন, তারাও ওইভাবে হিন্দু চরিত্র আনেন না। উদার, মহৎ হওয়া অতি সহজ নয়। মহৎ শিল্পীই খাঁটি শিল্পী।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’র হোসেন মিয়া এবং ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ উপন্যাসের কবি মনসুর চরিত্রের মতো উঁচু মাপের, শিল্প নিকষিত চরিত্র একটিও নেই বাংলা উপন্যাসে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই ধর্মনিরপেক্ষতার যথার্থ চরিত্র এঁকেছেন। মানতে যদি হয়, তাহলে মানিকের অঙ্কিত ধর্মনিরপেক্ষতা মানতে হবে।
ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো আদর্শের বুলি নয়, এক ধরনের বাস্তবতা। হোসেন মিয়া তার ময়না দ্বীপে ধর্মের ফ্যাকড়া বাঁধাতে চায় না। ধর্মকে কোনো ফ্যাক্টর হিসেবেই প্রশ্রয় দিতে চায় না। তার দরকার মানুষের। সে মানুষ যদি অবৈধ নারী-পুরুষের যৌনমিলনে সৃষ্টি হয়, তাতেই বা কী? মসজিদ-মন্দির তো দাস খাটবে না, চোরাচালান দেবে না, ফসল ফলাবে না, বিরান জঙ্গল কেটে মনুষ্য বসতি গড়বে না। তাহলে ওসব দিয়ে কী হবে?
কেতুপুরের জেলেপাড়া সম্পর্কে মানিক বলেন : ‘বিচলতি ও উত্তেজিত হইয়া এদিক ওদিকে চাহিতে চাহিতে কুবের দেখিতে পাইল, জহর, আমিনুদ্দি এবং আরো দুজন মুসলমান মাঝি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে একদিকে বসিয়া আছে। ধরিতে গেলে এরাই কেতুপুরের মুসলমান মাঝির সমাজ, আরো দু-চারজন যারা আছে তারা একান্ত নগণ্য। এদের সংখ্যা পাঁচ-ছয় ঘরের বেশি হইবে না। জেলে পাড়ার পূর্বদিকে এদের একত্র সন্নিবেশিত বাড়িগুলোতে বেড়ার বাহুল্য দেখিয়া সহজেই চিনিতে পারা যায়। যতোই জীর্ণ হইয়া আসুক, ছেঁড়া চট দিয়া সুপারি গাছের পাতা দিয়া মেরামত করিয়া বেড়াগুলোকে এরা খাড়া করিয়া রাখে। অথচ খুব যে কঠোরভাবেই পর্দা প্রথা মানিয়া চলে তা বলা যায় না। মেয়েদের বাহিরে না আসিলে চলে না। নদীতে জল আনিতে যাইতে হয়। পুরুষেরা কেহ বাড়ি না থাকিলে দোকানে সওদা আনিতে যাইতে হয়, বাড়ির আনাচে-কানাচে লাউ-কুমড়া ফলিলে, মুরগিতে ডিম পাড়িলে, গ্রামে গিয়া বেচিয়া আসিতে হয়। বেড়াগুলো পর্দা রাখে শুধু অন্দরের আর এমন বৌ ঝি বাড়িতে যদি কেহ থাকে যাহার বয়স খুব কাঁচা তাহার। এরা এবং জেলেপাড়ার অমুসলমান অধিবাসীরা সদ্ভাবেই দিন কাটায়। ধর্ম যতোই পৃথক হোক, দিনযাপনের মধ্যে তাদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নাই। সকলেই তারা সমানভাবে ধর্মের চেয়ে এক বড় অধর্ম পালন করে দারিদ্র্য। বিবাদ যদি কখনো বাধে, সে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিবাদ, মিটিয়াও যায় অল্পেই। কুবেরের সঙ্গে সিধুর যে কারণে বিবাদ হয়, আমিনুদ্দির সঙ্গে জহরের যে কারণে বিবাদ হয়, কুবের-আমিনুদ্দির বিবাদও হয় সেই কারণেই। খুব খানিকটা গালাগালি ও কিছু হাতাহাতি হইয়া মীমাংসা হইয়া যায়। মধ্যস্থ হয়তো করে জহের মাঝিই।’
সমাজের এটাই আসল চিত্র। মানিক সচেতন ছিলেন, একই সমাজে হিন্দু-মুসলমান উভয়ই বসবাস করে। এখনো এই সচেতনতার অভাব হাল আমলের আধুনিক কথাসাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়।

http://www.munshigonj.com/Special/Manik100/Manik100.htm