মুন্সীগঞ্জের দুই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে তীব্র একটিতে বিএনপি’র বিজয় প্রায় নিশ্চিত

আবু সাঈদ সোহান মুন্সীগঞ্জ
আসন্ন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী গণসংযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রার্থীরা। প্রার্থীদের মধ্যে শঙ্কা থাকলেও সাধারণ ভোটাররা রয়েছেন স্বস্তিতে। তারা যোগ্য ও সৎ প্রার্থীদের ভোট দিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তিনটি আসনেই ভিভিআইপিরা ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। তাই সাধারণ ভোটারদের মনে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
এ জেলার তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ২৬ জন। তাদের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের তিনটি আসনে ১১ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বিভিন্ন কারণে। এ দিকে বড় দুই দলের প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও ঋণ খেলাপি হওয়ায় মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব এম ইদ্রিস আলী প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়েন। একই আসনে মুন্সীগঞ্জ পৌর মেয়র হওয়ায় হাইকোর্টের রায় তার বিরুদ্ধে গেলে বাদ পড়েন জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান। তবে আপিলের সুযোগ থাকায় নিশ্চিত হতে আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। এ ছাড়া অন্যদের মধ্যে বাদ পড়েন­ মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে গোলাম মোস্তফা সেন্টু (বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন), দেলোয়ার হোসেন (স্বতন্ত্র), মহিউদ্দিন মাঝি (ইসলামি আন্দোলন)। মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে কামরুজ্জামান জামাল (বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন), কামাল উদ্দিন মিয়া (স্বতন্ত্র), নূর হোসেন নবী (ন্যাশনাল পিপলস পার্টি), মনিরুল ইসলাম মনির (ফিন্সডম পার্টি) এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে মো: ওমর ফারুক লিটন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) ও লিয়াকত আলী খান (ইসলামী ফন্সন্ট বাংলাদেশ) প্রমুখ।
তবে যত যাই হোক না কেন সাধারণ ভোটারদের মতে, মুন্সীগঞ্জের তিনটি আসনের মধ্যে দু’টিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর একটি আসনে বিএনপি’র জয়লাভের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসন (শ্রীনগর ও সিরাজদিখান) : এ আসন থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী নির্বাচন করবেন। তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী প্রবীণ রাজনীতিবিদ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে তিনিও নির্বাচন করবেন এ আসনে। তিনি জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে বাতিল হয়ে যাওয়া ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন শ্রীনগর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে বি. চৌধুরীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) মনোনয়ন পেয়েছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এখানে মূলত লড়াইটা হবে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের। বিকল্প ধারা নিজ প্লাটফর্ম থেকে দাঁড়িয়েছে বলে ভালো করার সুযোগ কম। মহাজোটের প্রার্থী হলে পাসের সুযোগ থাকার সম্ভাবনা ছিল। এ আসনে বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম এমপি হয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এলাকার রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের সুযোগ-সুবিধার জন্য যা যা করণীয় তা করেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকার ভোটাররা। এদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সুকুমার রঞ্জন ঘোষের জনপ্রিয়তা রয়েছে আগে থেকেই। তার ভোটব্যাংক সংরক্ষিত। তৃণমূল নেতা হিসেবে বিপদে-আপদে সবাই তাকে কাছে পায় বলে এলাকাবাসী জানান।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৭১ নম্বর সংসদীয় মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে এবার ভোটারসংখ্যা ৩ লাখ ২৫ হাজার ১৩৮টি। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৫ হাজার ২২৩ জন ও মহিলা ভোটারসংখ্যা ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯১৫ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৩২টি ও ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭০০টি।
মুন্সীগঞ্জ-২ আসন (লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী) : ’৭৫-পরবর্তী কোনো নির্বাচনে আ’লীগ এ আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ছিল ক্ষমতায়। তবে এবার সম্ভাবনা আছে বলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। দ্বিতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ সংক্ষরিত আসনের সাবেক এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। আন্দোলন-সংগ্রামে জেল খাটা এ নারী নেত্রীর প্রতি দলের ছোট-বড় সবাই শ্রদ্ধাশীল সবাই তার জয়ের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। এ আসনে গতবারের এমপি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা বিএনপি’র মনোনীত হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তাকে এলাকার জনগণ দানশীল ব্যক্তি হিসেবে বহু আগে থেকেই জানেন। রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, খেলার মাঠসহ অনেক কিছুই করেছেন এই ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। গতবার প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন এলাকার সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। ফলে লড়াই যে বিএনপি- আ’লীগের মধ্যে হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ আসন থেকেও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী নির্বাচন করবেন। জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব কুতুব উদ্দিন আহম্মেদ। তাদের গণসংযোগ চোখে পড়ে না।
নির্বাচন অফিস জানায়, ১৭২ নম্বর সংসদীয় মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে এবার ভোটারসংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৭১টি। তার মধ্যে পুরুষ ভোট ১ লাখ ১৫ হাজার ৫শ’ ৭৯ এবং মহিলা ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯২ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৯টি ও ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫৪৭টি।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসন (মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া) : বিএনপি ’৭৯ সাল থেকে এ আসনে জয়লাভ করে আসছে। এ আসনে বিএনপি থেকে নমিনেশনপ্রাপ্ত হয়েছেন বিএনপি’র স্খায়ী কমিটির সদস্য সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম। তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন তেমনটাই আশা করছেন তার দলের নেতাকর্মীরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, আওয়ামী লীগে নতুন মুখ সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব এম ইদ্রিস আলী তৃণমূল নেতাদের তেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন না। মহিউদ্দিন পরিবারের দীর্ঘ দিনের লিডারশিপ পরিবর্তন শহরের কোনো নেতাই সহজভাবে নিতে পারছেন না এবং সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ঋণখেলাপির দায়ে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। তিনি আপিল করবেন বলে জানা গেছে। তার পরও তার দলের নেতাকর্মীরা আশা করেন এম ইদ্রিস আলী এ আসনে জয়লাভ করবেন। অন্য দিকে বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন সাবেক শহর বিএনপি’র সভাপতি মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট মুজিবর রহমান। তিনি বর্তমানে জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। তিনিও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে তিনিও মেয়র পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না বলে হাইর্কোট রায় দিয়েছেন। এ কারণে তার নির্বাচন করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম ক্লিনম্যান হিসেবে পরিচিত। জেলার সার্বিক উন্নয়নে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মুক্তারপুর সেতু নির্মাণ, মিরকাদিম নৌবন্দর, টেকনিক্যাল কলেজ, যুব উন্নয়নসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। বিগত বিএনপি সরকার আমলে উন্নয়ন আর শামসুল ইসলাম দুই সমার্থক হয়ে উঠেছিল। এ দিকে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বর্তমানে কেউ নেই। কমিউনিস্ট পার্টির মাঠে রয়েছেন জেলা সভাপতি শ ম কামাল।
জেলা নির্বাচন অফিস থেকে জানা গেছে, (মুন্সীগঞ্জ-৩) আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭৬৫টি। তার মধ্যে পুরুষ ভোট ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৪ এবং মহিলা ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬১ হাজার ৪১ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৫টি এবং ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭৮৯টি।