বিপজ্জনক অবস্থায় মাওয়ার নৌচলাচল

শ্যামল কান্তি নাগ
বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে চলছে পদ্মার মাওয়াঘাটের নৌচলাচল। উত্তাল পদ্মায় আড়াআড়িভাবে চলাচলকারী মাওয়া-কাওরাকান্দি রুটের অধিকাংশ লঞ্চের কোনো ফিটনেস নেই। অর্ধশতাধিক লঞ্চের রয়েছে মারাত্মক ত্রুটি।সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এখনি এ লঞ্চগুলো মাওয়াঘাটে চলাচল বন্ধ না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে এ ঈদে নৌপারাপারে দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নৌদফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, মাওয়া ও কাওরাকান্দি পদ্মার পূর্ব এবং পশ্চিম তীর। আড়াআড়িভাবে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সব জেলার যোগাযোগ হয় পদ্মার এ পয়েন্টের ওপর দিয়ে। এ রুটে যাত্রী পারাপারে রয়েছে কমপক্ষে ৯০টি লঞ্চ।

এর মধ্যে গত জুন পর্যন্ত মাত্র ১৫টি লঞ্চের চলাচলের ফিটনেস ছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সার্ভে করে না ৪৫টিরও বেশি জাহাজ। এগুলো চলছে বড় ধরনের ত্রুটি নিয়ে। এদের চলাচলের কোনো সময়সূচিও নেই ।

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের এক প্রজ্ঞাপণে বলা হয়েছিল, যেসব নৌযান পরপর তিন বছর সার্ভে করবে না তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল বলে গণ্য হবে। ওই প্রজ্ঞাপণের ঘোষণা অনুযায়ী গেল ৩০ জুলাই ছিল সর্বশেষ সার্ভে করার সময়সীমা। এ সময়ের মধ্যে মাত্র ১৫টি লঞ্চ নারায়ণগঞ্জ সার্ভে অফিসে সার্ভে করেছে। বাকিরা বরাবরের মতোই অবৈধভাব চলছে। তাদের বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ওই রুটে অবৈধভাবে যাত্রী পারাপার করছে ২৫০টি স্পিড বোট। আইনের তোয়াক্কা না করে বিপজ্জনকভাবে পারাপার করা হচ্ছে যাত্রীদের। যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি, হয়রানি এবং মাঝ নদীতে হাইজ্যাকের মতো ঘটনা ঘটাই এর মধ্যে আদালত ৭টি স্পিড বোটের মালিককে জেলহাজতের সাজা প্রদান করেছে। তবে সম্প্রতি ১৯টি স্পিড বোট রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এসেছে বলে জানা গেছে।

ওই রুটের অনেক লঞ্চ মালিক বলেছেন, মাওয়া ঘাটের ইজারা সংক্রান্ত জটিলতায় তারা সার্ভে করান না। কিন্তু অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন এটা কোনো যৌক্তিক কারণ নয়। ইজারার সঙ্গে নৌ রেজিস্ট্রেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। গাফিলতি এবং রাজস্ব ফাঁকি দিতেই নৌমালিকরা সার্ভে করান না।

একজন নৌমালিক ফরিদ হোসেন বলেছেন, তারা সার্ভে করাতে চান। তবে নানা জটিলতার কারণে ভয়ও পাচ্ছেন। এ ছাড়া মাওয়া ঘাটের নৌকর্মকর্তাদের তদারকি না থাকায় অনেক লঞ্চ মালিকই শিথিলতা দেখিয়েছেন। দীর্ঘদিন সার্ভে না করানোতে তেমন অসুবিধা না হওয়ায় ওইভাবেই চলছে এখানকার লঞ্চগুলো।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু লঞ্চ মালিকদেরই গাফিলতি নয়, এর সঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষেরও গাফিলতি জড়িত রয়েছে। ওই সূত্র বলেছে, বছরের পর বছর ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চগুলো অবৈধভাবে চললেও ঘাট মালিক হিসেবে বিআইডব্লিউটিএর কোনো নজরদারি নেই। তাদের পরিদর্শকরাও নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। এমনকি বন্দর অফিসের কর্মকর্তারাও নির্বিকার। একই অবস্থা সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের পরিদর্শকদেরও। এ ঘাটের পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা শফিক আইয়ুব কখনোই লঞ্চগুলোকে রাজস্বখাতে আনার পদক্ষেপ নেননি। এমনকি আইনের আওতায় আনতে একবারও এ লঞ্চগুলোর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেনি সংশ্লিষ্টরা। ওই সূত্রের ধারণা, ঘুষ আর উৎকোচ দিয়ে নির্ভাবনায় লঞ্চগুলো চালাচ্ছে মালিকরা।

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের একটি তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ঈদে দুর্ঘটনামুক্ত যাত্রীপারাপার নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ লঞ্চগুলো রাজস্ব খাতে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর।

চলতি বছরের ১২ জুলাই নারায়ণগঞ্জের জাহাজ জরিপকারক প্রকৌশলী এ আর শাহরিয়ার, মূখ্য পরিদর্শক জাহিদ হোসেন এবং পরিদর্শক শফিক আইয়ুব মাওয়াঘাটের লঞ্চগুলো পরিদর্শন করেন। ২৬ জুলাই আবারো পরিদর্শনে যান প্রকৌশলী শাহরিয়ার এবং পরিদর্শক আব্দুল হাই। তখন অধিকাংশ লঞ্চে বড় ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করেন ওই দুই পরিদর্শক। এর মধ্যে অনিরাপদ ইঞ্জিন রুমে পানি রোধক ব্যবস্থা না থাকা, অনভিজ্ঞ ও অপ্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মাস্টার ড্রাইভার দিয়ে নৌযান চালানো, নৌযান কাঠ ও স্টিলের সংমিশ্রণ এবং কোনো লঞ্চেরই জানালা দরজা ও জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় উপকরণ না থাকার বিষয় রয়েছে।

এসব ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও লঞ্চগুলোকে রাজস্ব খাতে এবং সার্ভের আওতায় আনতে নারায়ণগঞ্জ সার্ভে অফিস তিন মাসের বিশেষ সুবিধা দেয়ার আবেদন করে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরে। এই সময়ের মধ্যে লঞ্চগুলো রেজিস্ট্রেশন এবং সার্ভের আওতায় আসারও তাগাদা দেয়া হয়। ৩১ আগস্ট প্রধান প্রকৌশলী এক আদেশ বলে নারায়ণগঞ্জ সার্ভে অফিসকে তিন মাসের বিশেষ সুবিধা দেয়ার অনুমতি দেন। ওই তিন মাসও পেরিয়ে গেছে গেল অক্টোবরে। বিশেষ সুবিধা পাওয়ার পরও মাওয়া ঘাটের একটি অবৈধ লঞ্চও সার্ভের আওতায় আসেনি। কিন্তু ওই অবৈধ লঞ্চগুলো এখনো যাত্রীপারাপার করে চলেছে। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএ এবং সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলে জানা গেছে।

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মূখ্য পরিদর্শক জাহিদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেছেন, লঞ্চগুলোতে সমস্যা আছে। কতগুলো লঞ্চ সার্ভের আওতায় এসেছে। চেষ্টা চালানো হচ্ছে তাদের সার্ভের আওতায় আনার।

বেআইনিভাবে চলা লঞ্চগুলো আসন্ন পবিত্র ঈদে যাত্রীপারাপারের সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা ব্যাপক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটলে তার দায়দায়িত্ব কে নেবে অনেকের মুখেই এখন এ প্রশ্ন।