বিনোদিনী ও মঞ্চকুসুম: শুদ্ধ সময়ের ব্যবধান

২৯ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:০৬
ভারতীয় নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী ব্রহ্মা যদি সত্যিই ঋগবেদ থেকে পাঠ্য, সামবেদ থেকে গীত, যর্জুবেদ থেকে অভিনয় এবং অথর্ববেদ থেকে রস নিয়ে নাট্যবেদ রচনা করে থাকেন, তাহলে সেই নাট্যবেদের ষোলো কলাই পূরণ হয় শিমূল ইউসুফের ‘বিনোদিনী’র মঞ্চায়নে। বিষয়টি এতো সহজ ছিলো না, যতোটা সহজ হলে কয়েক রাত ঘুমের শ্রাদ্ধ হয়। ঢাকা থিয়েটারের উদযোগ আর কয়েকজন উদ্যোমী মানুষ- নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সেলিম আল দীন এবং সাইমন জাকারিয়াসহ আরো বহুর কান্তিহীন ও দীর্ঘ প্রয়াস এবং প্রতক্ষার ফসল এই বিনোদিনী।

বিনোদিনী একটি একাঙ্কিকা এবং এককভাবে সু-অভিনীত একটি নাটক। লিখেছেন, অবশ্যই গবেষণা করে লিখেছেন- সায়মন জাকারিয়া। প্রধান সহায়ক হলো স্বয়ং বিনোদিনী। অর্থাৎ বিনোদিনীরই লেখা আত্মজীবনী। যা সাধুভাষায় এবং স্বাদুভাষায় লেখা ‘সুন্দর সাবলীল গদ্য।’ এটিকে ভেঙে নাট্যরচনার সাহস প্রথমে হলো না ঠিকই- তবে পথ বেরিয়ে এলো ঠিকঠিক। নাটকটি করা হবে- বিনোদিনীর ভাষাতেই অর্থাৎ সেই সাধু ও স্বাদু ভাষাতেই। বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির যে অভিজ্ঞতা ঢাকা থিয়েটারের রয়েছে তার ভরসাতেই কাজ শুরু হলো। কাণ্ডারী শিমূল ইউসুফ- নাম ভূমিকায় যখন অভিনয় করেন তখন মনে হয় উনবিংশ শতাব্দীর বিনোদিনী নক্ষত্রলোক ছেড়ে ভর করেছেন শিমূলের ওপর। শিমূলের মতা এমনই, তিনি টেনে নিয়ে যান ঐ কালের আবর্তে এবং আবির্ভুত হন বিনোদিনীর রূপে, যেন ওটাই তাঁর স্বরূপ, বাকি সব মিছা। দর্শক চোখের সামনে দেখতে থাকেন এক সময়কার মঞ্চ কাঁপানো অভিনেত্রীর ছুটে চলা, থমকে বসে পড়া আবার নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে থরথর পায়ে পথ চলা। দর্শক দেখতে থাকেন ‘বিস্মৃত কুসুমের সুবর্ণ শ্মশানভস্ম’ কী করে থিয়েটার ভালোবাসে, আবার কী করে অভিমানে চলে যায় দূর বাসে- থিয়েটার থেকে বহুদূরে।

বিনোদিনী- ‘জাতিস্মরের সুবর্ণ ধূলা’

‘বিনোদিনী’ নাটকটি যাঁরে নিয়ে নির্মিত তাঁর সম্পর্কে ঢাকা থিয়েটারের প্রদর্শনী পুস্তিকায় লেখা রয়েছে:
‘শ্রীমতি বিনোদিনী দাসীর জন্ম আনুমানিক ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায়। মাত্র ১১/১২ বছর বয়সে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম মঞ্চাবতরণ করেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে শত্র“সংহার নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায়। অতঃপর ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গ্রেট ন্যাশনাল, বেঙ্গল, ন্যাশনাল ও স্টার থিয়েটারে তৎকালীন যাবতীয় শ্রেষ্ঠ নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে অসামান্য যশ লাভ করেন। মাত্র ২৩/২৪ বছর বয়সে তিনি তাঁর খ্যাতি ও মতার চরম সিদ্ধির লগ্নে রঙ্গালয়ের সংশ্রব চিরতরে ত্যাগ করেন। বিনোদিনী মাত্র ১২ বছর অভিনয় করেছেন প্রায় ৮০টি নাটকে ৯০টির অধিক ভূমিকায়। বিনোদিনীকে তখনকার সাময়িক পত্রিকাগুলি ফাওয়ার অব দি নেটিভ স্টেজ, প্রাইমা ডোনা অব দি বেঙ্গলি স্টেজ, মুন অব দি স্টার কোম্পানি ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করেছিল।’
বিখ্যাত অভিনেতা গিরিশচন্দ্রের শিষ্য ছিলেন বিনোদিনী। তাঁর সম্পর্কে গিরিশচন্দ্র বলেছেন-
‘আমার চৈতন্যলীলা, বুদ্ধদেব, বিল্বমঙ্গল, নলদময়ন্তী, প্রভৃতি নাটক যে সর্বসাধারণের নিকট আশাতীত আদর লাভ করিয়াছিল, তাহার আংশিক কারণ, আমার প্রত্যেক নাটকে শ্রীমতি বিনোদিনীর প্রধান প্রধান ভূমিকা গ্রহণ ও সেই সেই চরিত্রের চরমোৎকর্ষ সাধন। অভিনয় করিতে করিতে সে তন্ময় হইয়া যাইত। আপন অস্তিত্ব ভুলিয়া এমন একটি অনির্বচনীয় পবিত্র ভাবে উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিত, সে সময় অভিনয়, অভিনয় বলিয়া মনে হইত না, যেন সত্য ঘটনা বলিয়া অনুভূত হইত।’ (ঘোষ ১৯৯৭: ১০০)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘মৃণালিনী’তে বিনোদিনীর অভিনয় দেখে বলেছিলেন, ‘ আমি মনোরমার চরিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম। কখনও যে ইহা প্রত্য দেখিব তাহা মনে ছিল না। আজ মনোরমাকে দেখিয়া আমার মনে হইল যে আমার মনোরামাকে সামনে দেখিতেছি।’ (ঐ)
সে সময়ের পৌরাণিক ও ভক্তিমূলক ভূমিকায় বিনোদিনী ছিলেন অদ্বিতীয় এবং শ্রেষ্ঠ। অধুনায় মঞ্চকুসুম খ্যাত শিমূল ইউসুফ, স্টার থিয়েটারের সেই শশীকেই ধরায় নামিয়ে এনেছেন, এবং সময়কে ঘুচিয়ে তৈরী করেছেন দুই সত্ত্বার অদ্বৈত হওয়ার আবহ। তাই মঞ্চ-সমুখে বসে শিমূল ইউসুফকেই মনে হয় শ্রীমতি বিনোদিনী দাসী- ‘জাতিস্মরের সুবর্ণ ধূলা’।

নাটক বিনোদিনী- ‘হাসন কাঁদন নিয়ে ঝড়ে জলে’

‘বোলো ভালোবাসায় ভাগ্য ফেরে না এবং মানুষের নখে নখে আমার উজ্জ্বল জীবনের সবক’টি পাপড়ি খসে গিয়েছিল। সামন্ত প্রভুর ভালোবাসার লালসায় রক্তবমির গন্ধ। সে গোপন থাক।’

নাটকের প্রবেশিকা পুস্তিকায় এমন মুখবন্ধের পর পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে আশু বর্ণনার অভিমুখ। বিনোদিনী দাসীর নিজের লেখা দুটি বই: ‘আমার কথা’ ও ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’ এবং তাঁর রচিত কবিতা গান নিয়ে গড়ে ওঠা নাটক ‘বিনোদিনী’র প্রতিটি লাইনে এবং প্রতিটি লাইনের মধ্যবর্তী অদৃশ্য লাইনে- ‘বিদর্ভ নগরী’ থেকে উঠে এসেছে নারীর শিল্পী হয়ে ওঠার সংগ্রাম, উত্তাল সমুদ্রে উঁচু ঢেউয়ের ফনায় ফেনা হওয়ার উচ্ছ্বাস এবং ‘বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া’র এক নাটকীয় জীবনের প্রক্ষেপিত গল্প। প্রথমেই দেখা যায় বিনোদিনী বলছেন তাঁর শৈশবে থিয়েটারের সাথে যুক্ত হওয়ার কাহিনী।

‘আমাদের বাটীতে একটি গায়িকা আইসা বাস করেন। তাহার নাম গঙ্গা বাইজী। .. .. আমার মাতামহী গঙ্গা বাইজীর নিকটে আমাকে গান শিখিবার জন্য নিযুক্ত করিলেন। সে সময় গঙ্গামণির ঘরে বাবু পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ব্রজনাথ শ্রেষ্ঠ বলিয়া দুইটি ভদ্রলোক তাঁহার গান শুনিবার জন্য প্রায়ই আসিতেন, শুনিতাম তাঁহারা নাকি নাটকের লোক। তাঁহারাই একদিন আমার মাতামহীকে ডাকিয়া বলিলেন যে, ‘তোমাদেও বড় কষ্ট দেখিতেছি তা তোমার এই নাতনিটিকে থিয়েটারে দিবে?.. .. আমার দিদিমাতা রাজী হইলেন। তখন পূর্ণবাবু আমাকে সুবিখ্যাত গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে দশ টাকা মাহিনাতে ভর্তি করিয়া দিলেন।’

প্রথম অভিনয়ের দিনটিকে বিনোদিনী বর্ণনা করেন এভাবে- ‘.. ‘শত্র“সংহার’ পুস্তকে একটি ছোট পার্ট দিলেন, সেটি দ্রৌপদীর একটি দাসী পার্ট, অতি অল্প কথা। কিন্তু যেদিন পার্ট লইয়া জনসাধারণের সম্মুখে স্টেজে বাহির হইতে হইল, সেদিন হৃদয়ভাব ও মনে ব্যাকুলতা কেমন করিয়া বলিব। সেই সকল উজ্জ্বল আলোকমালা, সহস্র সহস্র লোকের উৎসাহপূর্ণ দৃষ্টি, এইসব দেখিয়া শুনিয়া আমার শরীর ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিল, আর বুকের ভেতর র্গু র্গু করিতে লাগিল, পা দুটিও থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, আর চোরে ওপর সেই সকল উজ্জ্বল দৃশ্য যেন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হইয়া গেল বলিয়া মনে হইতে লাগিল।
আমি উইংসের পাশে দাঁড়াইয়া আছি, কি বলিবো, কি করিবো, -ভুলিয়া গিয়াছি। একবার মনে হইল আর স্টেজে যাইয়া কাজ নাই, ছুটিয়া পালাই। সে সময়ে হঠাৎ ধর্মদাস বাবু ছুটিয়া আসিয়া ধাক্কা দিয়া আমায় স্টেজে পাঠাইয়া দিলেন।
আমি দ্রৌপদীকে প্রণাম করিয়া, আমার বক্তব্য বলিয়া গেলাম- ঠিক যেমনটি শিখাইয়া দিয়াছিলেন, সেইভাবে। আমার বক্তব্য শেষ হইলে খুব হাততালি দিয়াছিল। ভেতরে আসিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। আমার পিঠ চাপড়াইয়া বলিলেন- ‘চমৎকার হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে.. ..।’ আর কত আশীর্বাদ করিলেন।.. .. শনিয়া ভারি আহাদ হইল। লাফাইতে লাফাইতে সাজ ঘরে যাইলাম (গেলাম)। কার্তিক পাল, আমাদের তখনকার ‘ড্রেসার’। তিনি বলিলেন- ‘আয় পুঁটি, আয়; বেশ হয়েছে।’
মহাশয়, এই আমার অভিনেত্রী জীবনের প্রথম পার্ট- একটি পরিচারিকার। ইহার পরে, কালে কত রানী সাজিয়াছি, কত কি সাজিয়াছি; কিন্তু জীবনের প্রথম সুখ-স্বপ্নের মতো-এই ‘ছোট দাসী’র পার্টটির কথা মনে করিতে আজিও কত-না আনন্দ!’

কিশোর বয়সের ভীরুতা ও উচ্ছ্বাস পর্ব শেষ করে বিনোদিনী দৃঢ় বিভঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছেন মঞ্চে এবং দতায় মাতিয়েছেন দর্শকপ্রাণ। হেমলতা, নীলদর্পন, বুদ্ধদেব, বিল্বমঙ্গল, নলদময়ন্তী প্রভৃতি নাটকে বিনোদিনী তিলেতিলে নিজেকে পরিণত করেছেন সেসময়কার গুরুত্বপূর্ণ অভিনয় শিল্পীতে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বিনোদিনী ‘গ্রেট ন্যাশনাল’ থেকে ‘বেঙ্গল থিয়েটার’; ‘বেঙ্গল থিয়েটার’ ছেড়ে বিনোদিনী আসেন ‘ন্যাশনাল থিয়েটারে’। এখানেই তিনি গিরিশচন্দ্রের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বিনোদিনী গিরিশচন্দ্র সম্পর্কে বলেন, ‘গিরিশবাবু আমাকে পার্ট অভিনয়ের জন্য অতি যতেœর সহিত শিা দিতেন। তাঁহার শিা দিবার প্রণালি বড় সুন্দর ছিল। .. .. অবসর মতো আমাদেও বাটীতে বসিয়া, অমৃত মিত্র, অমৃতবাবু আরো অন্যান্য লোকে মিলিয়া নানাবিধ বিলাতি অভিনেত্রীদের, বড় বড় বিলাতি কবি শেক্সপিয়র, মিল্টন, বায়রন, পোপ প্রভৃতি লেখা গল্পচ্ছলে শুনাইয়া দিতেন।.. .. তাঁহার এইরূপ যতেœ জ্ঞান ও বুদ্ধির দ্বারা অভিনয় কার্য শিখিতে লাগিলাম।.. .. এই সময় হইতে নিজের অভিনয়-নির্বাচিত ভূমিকা বুঝিয়া লইতে পারিতাম।’
গিরিশচন্দ্রের সাথে বিনোদিনীর সম্পর্ক ছিলো জবরদস্তি ও মান-অভিমানে। গিরিশচন্দ্র বিনোদিনীকে স্নেহ করতেন। আর সেই অধিকারেই গিরিশবাবু ‘নূতন নূতন বই ও নূতন নূতন প্যান্টোমাইমে’ খাটিয়ে নিতেন বিনোদিনী ও তাঁর সহশিল্পীদের। পরিশ্রম বেড়ে যাওয়ায় অসুস্থ্য হয়ে পড়েন বিনোদিনী। ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে বিনোদিনী যান কাশীধামে। অসুস্থ্যতা বাড়তে থাকে বিনোদিনীর। থিয়েটারে ফিওে আসতে সময় লাগে এক মাস। ফলে গোল বেঁধে যায় থিয়েটার কর্তৃপরে সাথে। বেতন দেয়া-নেয়া নিয়ে গন্ডগোলের এক পর্যায়ে ন্যাশনাল থিয়েটার ছেড়ে দেন বিনোদিনী। এসময় দারুণ সঙ্কটে পড়তে হয় তাঁকে। বিনোদিনীর জবানে- ‘এই সময় অতিশয় সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পড়িতে হইয়াছিল। আমাদের ন্যায় পতিতা ভাগ্যহীনা নারীদের টাল-বেটাল তো সর্বদাই সহিতে হয়, তবুও তাহাদের সীমা আছে; আমার ভাগ্য চিরদিনই বিরূপ ছিল। একে আমি জ্ঞানহীনা অধম স্ত্রীলোক, তাহাতে সুপথ-কুপথ অপরিচিতা। আমাদেও গন্তব্য পথ সততই দূষণীয়, আমরা ভালো পথ দিয়া যাইতে চাহিলে, মন্দ আসিয়া পড়ে, ইহা যেন আমাদের জীবনের সহিত গাঁথা। লোকে বলে আত্মরা সতত উচিত, কিন্তু আমাদের আত্মরাও নিন্দনীয় ! অথচ আমাদের প্রতি স্নেহ চে দেখিবার বা অসময় সাহায্য করিবার কেহ নাই !’

ঠিক ঐ সঙ্কটেই হাজির হয় আরেক সঙ্কট। প্রতারিত হন বিনোদিনী। এক সম্ভ্রান্ত অবিবাহিত যুবকের আশ্রয়ে ছিলেন বিনোদিনী। কথা ছিলো বিয়ে করবেন ঐ যুবক কিন্তু কথা রাখেননি তিনি। প্রতারিত নারীমন চাইছিলো না আরেক আশ্রয়ে পুনরাবৃত্তি হোক প্রতারণার নাটক। কিন্তু থিয়েটারের বন্ধুদের হাজার অনুরোধে আরেকজনের আশ্রয়ে গেলেন- থিয়েটারকে ধরে রাখার জন্য। কারণ সেই আশ্রয়দাতা- গুর্মুখ রায় বিনোদিনীর প্রেমে পড়েই রাজী হয়েছিলেন একটি থিয়েটার হল করে দেবেন। এতে গিরিশচন্দ্রসহ বিনোদিনীর অন্যান্য সহশিল্পীদের অভিনয় জীবন সঙ্কটমুক্ত হয়। ঠিক হলো বিনোদিনীর নামেই প্রতিষ্ঠিত হবে থিয়েটার হল। কিন্তু এক অজানা কারণে গিরিশচন্দ্র তা হতে দেননি। তাই ‘বিনোদিনী থিয়েটার; বা ‘বি. থিয়েটার’-এর বদলে হলের নাম হলো ‘স্টার থিয়েটার’। কষ্ট পেলেন বিনোদিনী। তাঁর কথায়- ‘দাশ বাবু প্রফুল্লভাবে বলিলেন যে, ‘স্টার।’ এই কথা শুনিয়া আমি হৃদয় মধ্যে অতিশয় আঘাত পাইয়া বসিয়া যাইলাম যে দুই মিনিটকাল কথা কহিতে পারিলাম না। কিন্তু পরে আত্মসংবরণ করিয়া বলিলাম- ‘বেশ’।.. .. বি-থিয়েটারের পরিবর্তে আমি স্টার থিয়েটারের একজন সাধারণ অভিনেত্রী হইলাম।’

একের পর এক প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার বিনোদিনী তাই নিজের স্কন্ধেই নেন সকল দায় ও দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘একটি কথা আজ আপনাদের বলি- পতিপ্রেম সাধ আমাদেরও আছে, কিন্তু কোথায় পাইব? লালসায় আসিয়া প্রেমকথা কহিয়া প্রেমকথা কহিয়া মনোমুগ্ধ করিবার লোকের অভাব নেই, কিন্তু কে হৃদয় দিয়া পরীা করিতে চান যে আমাদের হৃদয় আছে? আমরা প্রথমে প্রতারণা করিয়াছি, না-কি প্রতারিত হইয়া প্রতারণা শিখিয়াছি, অর্থ দিয়া কাহারও ভালোবাসা কেনা যায় না। আমরাও অর্থে ভালোবাসা বেচি নাই। এই আমাদের সংসারের অপরাধ।’

শারীরিক অসুস্থ্যতা ছিলোই, তার ওপর উনবিংশ শতাব্দীর এক শিল্পী নারীর জীবনে সম্ভাব্য নানা বাঁধা-বিপত্তি, ছলনার ত সবকিছু মিলিয়ে বিনোদিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তার ওপর যোগ হয় কন্যা শকুন্তলার মৃত্যু। থিয়েটার ছেড়ে দেন বিনোদিনী। অবসর বুঝে অবসর নিয়ে নেন তিনি। অবসর জীবনে কন্যার মৃত্যুশোকই অবলম্বন হয়ে ওঠে তাঁর। বিনোদিনী লেখেন-

অভাগিনীর জননী স্নেহ উপহার
লহ মাতা শকুন্তলা জননী আমার!
সংসারের সুখ যত, তোমাতে আছিল রত
তুমি ফেলে চলে গেছ অমর ভবনে
তব স্মৃতি লয়ে আছি সংসার কাননে

ফুরায়েছে সে স্বপন সে ঘুমের ঘোর;
হ’য়ে গেছে দুখিনীর সুখ-নিশি ভোর।
ক’বে আসি দয়া ক’রে, মৃত্যু লবে মোরে,
এই আশাপথ চেয়ে রয়েছি এখন
কালোস্রোত কতদিন ডুবিবে জীবন

একত্রিশ বছর বয়সে এসে বিনোদিনী দেখেন সুখ-স্বপ্ন ভঙ্গের বাস্তবতা। মেলাতে চান জীবনের ‘লেন-দেন’, মেলাতে পারেন না। অনন্ত পথের যাত্রী বিনোদিনী বলে ওঠেন- ‘পৃথিবীর ভাগ্যবান লোকেরা শুন, শুনিয়া ঘৃণার মুখ ফিরাইও। আর ওগো অনাথিনীর আশ্রয়তরু, স্বর্গের দেবতা, তুমিও শুন গো শুন! দেবতাই হোক, আর মানুষই হোক; মুখে যাহা বলা যায় কার্যে করা বড়ই দুষ্কর! ভালোবাসায় ভাগ্য ফেরে না গো, ভালোবাসায় ভাগ্য ফেরে না! ঐ দেখ আমার চিতাভস্মগুলি দূরে দূরে চলিয়া যাইতেছে, আর হায় হায় করিতেছে। ওগো! আমার আর শেষও নাই, আরম্ভও নাই গো!.. .. এই আমার পরিচয়।
ইতি
ভাগ্যহীনা, পতিতা কাঙ্গালিনী শ্রীমতি বিনোদিনী দাসী।’

নাটক বিনোদিনী- ‘একাঙ্কে ন কদাচিৎ বহূনি কার্যানি যোজযেৎ’

অ্যারিস্টটলের নাট্যবৃত্তে দুটি অংশ: গ্রন্থিবন্ধন বা জটিলতা এবং গ্রন্থি-মোচন বা জটিলতা-মোচন। নাট্যবৃত্তটি আবার অবলম্বন করে তিনটি বস্তুকে: আদি, মধ্য ও অন্ত। প্রত্যেক নাটকেই একটি মূল ভাববস্তু থাকে। সফল একাঙ্কিা নাটকে ঘটনা বহুমুখী বা বহুবিস্তারী হয় না; একটি পরিণতির দিকে নাট্যবৃত্ত পূরণ করে এগোতে থাকে।

বিনোদিনী একটি একাঙ্কিকা। এর চলন- একজন নারী অভিনয় শিল্পীর থিয়েটার জীবনে আসা এবং নিষ্ঠুর বেঁচে থাকায় প্রতারণা পেয়ে ভালোবাসার থিয়েটার ত্যাগ করা। সফল একাঙ্কিকার চরিত্র এটাই হবে- চলমান জীবন-যাপনের একটি অংশ বিদ্যুৎ চমকের মতো আলোকিত করবে জীবনের একটি বিশেষ দিক। যেমনটা হয়েছে আলোচ্য নাটকে। উনবিংশ শতাব্দীর জীবন যাপনে থিয়েটারের বাস্তবতায় আমাদের সামনে ঝলসে উঠেছে এক নারী শিল্পীর নিরন্তর প্রতারিত হওয়ার কাহিনী, প্রকৃত প্রেম পাওয়ার আকুতি এবং ভালোবাসার বস্তু বিসর্জন দিয়ে অনন্ত শোক নিয়ে বেঁচে থাকার আত্মতৃপ্তি।

এই একাঙ্কিার সফলতা শুধু রচনাতেই নেই, আছে অভিনয়ের মধ্যেও। একটি যেন আরেকটির প্রাণ-ভোমরা। বিনোদিনীর জীবনের প্রধান মুহুর্তগুলো, তাঁর হাসি-কান্না ও বেদনা আরো অন্যভাবে প্রকাশ করা যেতো বললে- যথেষ্ট সন্দেহ দানা বেঁধে ওঠে। এই একাঙ্কিকার সফলতা এখানেই।

মঞ্চে বিনোদিনী, ‘বিনোদিনী’র মঞ্চ

ভরত নাট্যশাস্ত্রে যাকে বলা হয়েছে ‘সোপানাকৃতি পীঠকম’, পশ্চিমে যা প্রোসেনিয়াম নামে পরিচিত সেই রীতিতেই পরিবেশিত হয় নাটক বিনোদিনী। মঞ্চ তখন থাকে উত্তর, পশ্চিম, পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্যভাগে বিভক্ত। এই পাঁচ অংশ ভাগ করে চলতে থাকে বিনোদিনীর অভিনয়। কখনো সামনে এসে, কখনো বা পিছে বা পাশে সরে গিয়ে উপস্থাপিত হতে থাকে বিনোদিনীর জীবনের নানা বাঁক ও চড়াই-উৎড়াই। মঞ্চের এই পঞ্চাংশের সাথে তাল মিলিয়ে রাখা হয় আলোক ব্যবস্থা। যখন যেদিকে সরে বর্ণিত হচ্ছে বিনোদিনীর জীবনী, সেদিকেই জ্বলে উঠছে নরম স্পট আলো। আলোর রঙ ব্যবহার হচ্ছে নাটকের মুড বুঝে। সাথে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে রয়েছে চামড়ার বাদ্য ও হারমনিয়াম।

মঞ্চের ঐ পাঁচ অংশের সামনের অংশে রাখা হয় একটি নিচু কাঠের টুল, তার ওপর লেখার সামগ্রী। আর বাকী চার অংশে বেতের বসার আসন। পেছন দিককার আসনটির পেছনে থাকে একটি প্রায় বৃত্ত। মঞ্চের দুই পাশে থাকে চারটি মানবাকৃতি- বেত দিয়ে তৈরী। সামনে টুলটার একটু সামনে ওপরে থাকে তৃতীয় বন্ধনীর মতো করে টাঙানো একটি পর্দা। যেটি নাটকের চলন অনুযায়ী দুইপাশ দিয়ে নেমে আসে আবার উঠে যায় ওপরের দিকে।

অভিনেত্রী শিমূল ইউসুফ নিজে পড়েন শাড়ি, সাথে রাখেন একখন্ড শাদা কাপড়। সেই কাপড় কখনো হয়ে ওঠে মাথার পাগড়ি, কখনো বা মাথার ঘোমটা, কখনো বা গায়ে জড়ানো চাঁদর। নাট্যপ্রয়োগ ও অভিনয়রীতিতে বিনোদিনী- লোকনাট্যরীতির। সাজ-সরঞ্জামের ব্যবহারেও তাই সেরকম আয়োজনÑ বিশেষ করে লেটো ও পালাগানের অভিনয়রীতির মতো। সাথে যুক্ত হয় ধ্র“পদী অভিনয়রীতি। নৃত্য ও ধ্র“পদী সঙ্গীত তো আছেই। এসব ছাড়াও সংলাপ প্রপেন ও শারীরিক ভঙ্গি জাপানী ‘কাবুকি’র মতো।

বিনোদিনী, বিনোদিনী ও বিনোদিনী

শতাধিক বছর আগে এক পতিতা নারীর শিল্পী হয়ে ওঠা, তাঁর জীবনবোধ, তাঁর শিল্পসাধনা, শিল্পসৃষ্টি ও শিল্পদৃষ্টি অভিভূত করে এ যুগের আমাদের। আমাদের নিমজ্জিত করে তাঁর জীবনের দীর্ঘশ্বাস ও অভিমানী অশ্র“। ‘বিনোদিনী’ দেখার পর তাই শ্রবনে কেবল বাজে বিনোদিনী, বিনোদিনী ও বিনোদিনী।
(রচনাকাল: ২০০৭ ইঙ্গাব্দ, লেখাটি কোথাও প্রকাশ হয়নি।)

সূত্র:
১. ‘বিনোদিনী’ নাটক, রচনা: সায়মন জাকারিয়া, নাট্য ত্রৈমাসিক থিয়েটার, ৩৫ বছর পূর্তি সংখ্যা, ২০০৬
২. ‘বিনোদিনী’ নাটকের প্রদর্শনী পুস্তিকা, ৫০তম প্রদর্শনী, ২০০৭
৩. নাট্যতত্ত্ব ও নাট্যমঞ্চ, ডক্টর অজিতকুমার ঘোষ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৭
৪. কাব্যনির্মানকলা অ্যারিস্টটল, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, বর্ণ মিছিল, ঢাকা, ১৯৭৬

http://www.somewhereinblog.net/blog/bidhanrebeiro/28875574

[ad#co-1]