মুন্সীগঞ্জে পাল্টে গেছে হিসাব-নিকাশ

munshigonj-election-2008নতুন সীমানায় নির্বাচন
শহীদ-ই-হাসান তুহিন মুন্সীগঞ্জ থেকে
জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবার নতুন সীমানার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে মুন্সীগঞ্জের একটি আসন কমে দাঁড়িয়েছে ৩-এ৷ আসন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন দলের নেতাদের ভোটের হিসাব-নিকাশও পাল্টে গেছে৷ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা রয়েছেন সংশয় আর উত্‍কণ্ঠায়৷ একই সঙ্গে দলের মনোনয়ন পেতে চলছে জোর লবিইং৷ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ধরনা দিচ্ছেন শীর্ষপর্যায়ে৷
মুন্সীগঞ্জ জেলায় নতুন নির্বাচনী সীমা ঘোষণা হওয়ার পর আসন সংখ্যা ৪ থেকে কমে ৩-এ দাঁড়িয়েছে৷ আসনগুলো হচ্ছে মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলা), মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলা) এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ (মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলা)৷
নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে চারটি আসন ছিল মুন্সীগঞ্জের৷ আসন কমে যাওয়ায় গতবার মনোনয়ন পাওয়া দলীয় নেতাদের মধ্য থেকে একজন বাদ পড়বেন৷ মনোনয়ন দৌড়ে কে পিছিয়ে পড়েন এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীরা উত্‍কণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন৷
মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা অথবা বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন মনোনয়ন পেতে পারেন৷ এর আগে মিজানুর রহমান সিনহা মুন্সীগঞ্জ-২ থেকে পরপর দুবার এমপি নির্বাচিত হন৷ তাই তিনি মুন্সীগঞ্জ-২ থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে জোর লবিইং চালাচ্ছেন৷ কিন্তু সাবেক মন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জ-২ অথবা মুন্সীগঞ্জ-৩ থেকে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন৷ যদিও এম শামসুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জ-৩ আসন থেকে আগে তিনবার এমপি নির্বাচিত হন৷ মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বিকল্পধারার মাহী বি. চৌধুরীর উপ-নির্বাচনে বিএনপির প্রাথর্ী শ্রীনগর বিএনপির সভাপতি মো. মমিন আলী পরাজিত হন৷ মমিন আলী পরাজিত হওয়ার পর জাতীয় পার্টির নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বিএনপিতে যোগ দেন৷ ২২ জানুয়ারি ২০০৬-এর বাতিল হয়ে হওয়া নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-১ থেকে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে বিএনপি মনোনয়ন দেয়৷ এদিকে বিএনপির একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, দলে নতুন যোগ দেয়ায় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন না দিয়ে ঢাকার কোনো আসন থেকে মনোনয়ন দিতে পারে বিএনপি৷
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসন থেকে জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল হাই পাঁচবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন; তবে এবার দল থেকে তার মনোনয়ন পাওয়া অনেকটা অনিশ্চিত৷ মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া দুটি উপজেলায় তার জনপ্রিয়তা থাকলেও এম শামসুল ইসলামের কারণে তিনি মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন৷ তবে এম শামসুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জ-৩-এর নির্বাচনী এলাকায় সম্পূর্ণ নতুন৷ নতুন এলাকায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারবেন কি না তা নিয়ে অধিকাংশ স্থানীয় নেতাকমর্ীর মধ্যে সংশয় রয়েছে৷
এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতির কারণে তারাও সঙ্কটে রয়েছে৷ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন দুদকের মামলায় আসামি হওয়ায় পলাতক৷ তার নামে রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা৷ দুটি মামলায় তার ২০ বছর সাজাও হয়েছে৷ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. লুত্‍ফর রহমান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন রয়েছেন আত্মগোপনে৷ মো. লুত্‍ফর রহমান সমপ্রতি মিরপুরের একটি হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি৷ তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তোফাজ্জল হোসেন কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন৷ এ অবস্থায় তিনিও উধাও হয়ে যান বলে স্থানীয়রা জানান৷ মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় তার বিরম্নদ্ধে একটি মামলার ওয়ারেন্ট বের হওয়ায় তিনি আত্মগোপন করেন৷ এ পরিস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকমর্ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন৷
মুন্সীগঞ্জ-১ থেকে ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ৷ তিনি তখন বিএনপির প্রাথর্ী ডা. এ কিউ এম বদরম্নদ্দোজা চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন৷ এ কিউ এম বদরম্নদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা পার্টি গঠন করলে এবং ওই আসনে উপ-নির্বাচনে তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী বিএনপির প্রাথর্ী মো. মমিন আলীকে পরাজিত করেন৷ উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাহীকে সমর্থন করেছিল৷ এবারের নির্বাচনে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী৷ তবে বিকল্পধারাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠিত হলে মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে মাহী বি. চোধুরী মহাজোটের মনোনয়ন পেতে পারেন৷ ২০০১-এর নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগ প্রাথর্ী সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বিএনপির মিজানুর রহমান সিনহার কাছে পরাজিত হন৷ এবার নির্বাচনে এ আসন থেকে বিকল্পধারার সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরম্নদ্দোজা চৌধুরীর মহাজোটের পৰে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কথা৷ আর যদি কোনো কারণে বিকল্পধারা মহাজোট থেকে বেরিয়ে যায় তখন মুন্সীগঞ্জ-১ ও মুন্সীগঞ্জ-২ থেকে যথাক্রমে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ও সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রায় নিশ্চিত৷
এছাড়া জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম মেম্বার অ্যাডভোকেট শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জ-১ এবং জেলা জাপার সদস্য সচিব কুতুবউদ্দিন আহম্মেদ মুন্সীগঞ্জ-২ থেকে মনোনয়নের জন্য আবেদন করেছেন৷ জাপা মহাজোটের সঙ্গে এ দুটি আসন নিয়ে জোর লবিইং চালাচ্ছে৷ মুন্সীগঞ্জ-৩ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক প্রতিরৰা সচিব এম ইদ্রিস আলীর মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাও যথেষ্ট৷ তিনি নতুন মুখ হলেও অনেক আগে থেকে এলাকায় তত্‍পরতা চালিয়ে আসছেন৷
এ আসনে আওয়ামী লীগ নেতা মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান আনিস মনোনয়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন৷ তবে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলে তিনি উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন নিশ্চিত করবেন বলে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র৷ উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলে অবশেষে মুন্সীগঞ্জ-৩ থেকে স্বতন্ত্র প্রাথর্ী হবেন বলে তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে৷ এছাড়া জাপার সহসভাপতি ও মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুন্সীগঞ্জ-৩ থেকে মহাজোটের প্রাথর্ী হতে জোর লবিইং চালাচ্ছেন৷ যদিও মহাজোটের কাছে জাপার প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের আগাম চাওয়া ৬০ আসনের তালিকার মধ্যে মুন্সীগঞ্জের কোনো আসন নেই৷