হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাত্‍কার

haহুমায়ূন আহমেদ আমাদের সময়ের অভাবনীয় এক জনপ্রিয় লেখকের নাম৷ কথাসাহিত্যে তার প্রতিভার বিসত্মার ঘটলেও, তিনি শুরম্ন করেছিলেন কবিতা দিয়ে৷ তারপর নাটক, ছোটদের জন্য লেখা, সাইন্সফিকশন, চলচ্চিত্র পরিচালনা- শিল্প-সাহিত্যের এমনি নানা বিষয়ে হাত দিয়েছেন এবং প্রতিটি ৰেত্রে ছাপ রেখেছেন অনন্যতার৷ এই অভাবনীয় জনপ্রিয় লেখকের সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপচারিতা ঘটে আরেক জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলন-এর৷ সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার উলেস্নখযোগ্য অংশ ‘ইত্তেফাক সাহিত্য সাময়িকী’র পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হলো৷ ষাটতম জন্মদিনের প্রাক্কালে প্রকাশিত এই সাৰাত্‍কারটি পাঠকদের আরো আনত্মরিকভাবে হুমায়ূন আহমেদকে চিনতে সহায়তা করবে বলে আমাদের বিশ্বাস

ইমদাদুল হক মিলন: আপনি লেখক৷ তাই লেখালেখি দিয়েই শুরম্ন করা ভাল৷ আপনার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ লেখা কি একেবারেই আচমকা? এর আগে আপনি কি কিছু লিখেছেন কখনো?

হুমায়ূন আহমেদ: কবিতা লিখেছি৷ দৈনিক পাকিসত্মান পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে৷ তবে নিজের নামে লিখি নি৷ কবিতাগুলি আমার ছোটবোন মমতাজ আহমেদ শিখুর নামে পাঠাতাম৷ তার নামেই ছাপা হতো৷

মিলন: উপন্যাসে আসার ঘটনাগুলো বলেন- এই ধরেন- কীভাবে শুরম্ন, কীভাবে আইডিয়াটা এলো মাথায়ঃ

হুমায়ূন আহমেদ: প্রথমে তো আমি লিখলাম ‘শঙ্খনীল কারাগার’৷ যদিও প্রথমে এটা ছাপা হয়নি, কিন্তু উপন্যাস প্রথমে লেখা হয়েছিল ‘শঙ্খনীল কারাগার’৷ কিছুই করার ছিল না সেই সময়৷ আমার ঠিকমতো মনেও নেই৷ তবে এই উপন্যাসটা আমার বাবা পড়েছেন- এটা আমার জন্যে খুবই আনন্দের একটা ঘটনা৷

মিলন: মানে আপনার হাতে লেখা কপিটাই পড়েছেন ?

হুমায়ূন আহমেদ: হঁ্যা৷

মিলন: পড়ে কী বললেন ?

হুমায়ূন আহমেদ: আমাকে কিছু বললেন না৷ বাবার সঙ্গে আমাদের ভাইবোনদের দূরত্ব ছিল৷ বাবা সরাসরি আমাদের কিছু বলতেন না৷ ভায়া মিডিয়া কথা বলতেন৷ তাঁর যা বলার তিনি মা’কে বলতেন৷ মা আমাদের বলতেন৷

মিলন: তিনি আপনার মা’কে কী বললেন ?

হুমায়ূন আহমেদ: পৃথিবীর সমসত্ম পিতাই সনত্মানদের সামান্য প্রতিভাতেই মুগ্ধ হন৷ তিনিও হয়েছিলেন৷ তাঁর মুগ্ধতা যে উঁচু পর্যায়ে ছিল তার প্রমাণ পেলাম কিছুদিন পর৷ উনি তখন একটা রেডিও নাটক লিখে শেষ করেছেন৷ নাম ‘কত তারা আকাশে’৷ হঠাত্‍ সেই নাটকের পাণ্ডুলিপি আমার হাতে দিয়ে বললেন- তুই তোর মতো করে ঠিকঠাক করে দে৷ আমি আমার এক জীবনে অনেক সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছি- ঐ দিনের সাহিত্য পুরস্কার সব পুরস্কারের উপরে৷

ইমদাদুল হক মিলন: আমেরিকা থেকে আপনি ফিরে এলেন ‘৮৪-এর দিকে বোধহয় ? তার আগে, মাত্র চারটা বই লিখে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন৷ এটা একটা অবিস্মরণীয় ঘটনা৷ আপনি ফিরে এসে আবার লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হবার কথা ভাবলেন কী করে?

হুমায়ূন আহমেদ: হয়তো লেখালেখির বিষয়টা ভেতরে ছিল সবসময়৷ যদি ভেতরে থাকে তাহলে ‘লেখালেখি’ বিষয়টা মাথার গভীরে একধরনের চাপ দিতেই থাকে৷ এই চাপটা একটা কারণ হতে পারে৷ দেশে ফিরে এসেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছি৷ আবার আমি যে একজন লেখকও, ঐটাও তো মাথায় ছিল৷

মিলন: লেখালেখির ৰেত্রে বড় গ্যাপ পড়লে একটা অস্বসত্মি তৈরি হয়৷ আপনার সে অস্বসত্মিটা কি তৈরি হয়েছিল যে, এতদিন পরে আমি আবার শুরম্ন করলাম!

হুমায়ূন আহমেদ: এটা আসলে মনে করতে পারছি না৷ মনে হয় না ছিল৷ কারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যারা লেখালেখি করে, তারা এগুলো নিয়ে মাথা ঘামায় না৷ অনেকদিন লিখিনি তাতে কি হয়েছে? আবার লিখব৷ ইচ্ছা না করলে আবার বন্ধ করে দেব৷

মিলন: কিন্তু এই স্বতঃস্ফূর্ততা কি আপনার প্রথম থেকে ছিল নাকি আসত্মে আসত্মেঃ?

হুমায়ূন আহমেদ: না, আমার মনে হয় এটা শুরম্ন থেকেই ছিল৷ মাঝেমধ্যে এটা একটু কেটে গেছে, এটা বলতে পারো৷ কিছু কিছু লেখার ৰেত্রে খুবই চিনত্মা-ভাবনা করে লাইনগুলো লিখতে হয়েছে৷ একটা লাইন লিখে দ্বিতীয় লাইনটির জন্যে অপেৰা করতে হয়েছে৷ দ্বিতীয় লাইন আসি আসি করছে, আসছে না৷ এই অবস্থা৷

মিলন: এই যে দেশের বাইরে থেকে ফিরেই একটার পরে একটা বই আপনি লিখতে থাকলেন৷ তারপর ‘৮৫-তে আপনি ‘এইসব দিনরাত্রি’ শুরম্ন করেছিলেন৷ একটার পর একটা লেখা, পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করা, এই যে এই অবস্থাটা তৈরি হলো, এর পেছনে রহস্যটা কি বলে আপনার মনে হয়?

হুমায়ূন আহমেদ: এই অবস্থা যে তৈরি হয়েছিল, এই বিষয়টার একটা নরমাল আর একটা আধিভৌতিক ব্যাখ্যা আছে৷

মিলন: আপনি বলেন- আমরা দুটোই শুনি৷

হুমায়ূন আহমেদ: নরমাল ব্যাখ্যা হলো- আমি নাটক লেখা শুরম্ন করলাম৷ আমাদের দেশে নাটকের দর্শক তো অনেক বেশি৷ ‘এইসব দিনরাত্রি’ বহু লোক দেখা শুরম্ন করল এবং এরা মনে করল এই যে লোকটি নাটক লিখছে, তার একটা বই পড়ে দেখি না কেন! তারা বই কিনতে শুরম্ন করল৷ পাঠকদের আমার বইয়ের প্রতি আগ্রহী হবার পেছনে ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকটা কাজ করেছে বলে আমার নিজের ধারণা৷ একজন নতুন লেখক লিখবে আর সঙ্গে সঙ্গেই তার বই বিক্রি হবে- এটা তো হবার কথা না৷ আমার ধারণা আমার নাটক দেখে লোকজন আগ্রহী হয়েছে, একটা বই পড়ে হয়তো সেকেন্ড বই পড়তে চেয়েছে- এটা হতে পারে৷ আর আধিভৌতিক ব্যাখ্যা যেটা হলো- শহীদুলস্নাহ হলে যখন থাকি, তখন একসঙ্গে প্রকাশকদের কাছ থেকে আমি হঠাত্‍ কিছু বড় অংকের টাকা পেয়ে গেলাম৷ ২৫-৩০ হাজার টাকা৷ সেই সময় ২৫-৩০ হাজার টাকা অনেক টাকা৷ বই বিক্রির টাকা৷ তখনো বই লেখা বাবদ অ্যাডভান্স দেয়া শুরম্ন হয়নি৷ যেহেতু টাকা পেয়েছি, আমার খুব হাত উশখুশ করছিল টাকাটা খরচ করার জন্য৷ কাজেই করলাম কী গুলতেকিন এবং বাচ্চাদের নিয়ে গেলাম ইন্ডিয়াতে৷ এই টাকা শেষ না হওয়া পর্যনত্ম দেশ ভ্রমণ হবে এই হলো পরিকল্পনা৷ প্রথমে গেলাম নেপালে, নেপাল থেকে দিলিস্ন৷ ভাবলাম এত কাছে যখন এলাম মরম্নভূমি দেখে যাই৷ জয়সলমীরের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম৷ জয়সলমীরের পথে পড়লো আজমীর শরীফ৷ এত নাম শুনেছি- পথে যখন পড়লই তখন ভাবলাম যে, আজমীর শরীফ দেখে যাই৷ আজমীর শরীফ গেলাম৷ আমার সবচেয়ে ছোট মেয়েটি, বিপাশা, সে খুবই বিরক্ত হয়ে গেল; বলল- কোথায় নিয়ে এলে? চারদিকে ফকির৷ ফকিরে ভর্তি জায়গাটি৷ বিপাশার বয়স তখন তিন সাড়ে তিন; আমি তাকে বোঝালাম যে, এখানে একজন অতি বড় সাধু মানুষের কবর আছে৷ এখানে এলে আলস্নাহর কাছে যা চাওয়া যায়, তা পাওয়া যায়৷ দেখা গেল যে, এই কথা শুনে মানসিকভাবে সে স্বসত্মি বোধ করলো৷ তখন তাকে নিয়ে গেলাম কবর জিয়ারত করতে, জিয়ারত শেষ করে চলে আসবো, দেখি বিপাশা দাঁড়িয়ে৷ ব্যাপার কী? বিপাশা বলল, আমি যেটা চেয়েছি সেটা তো পাইনি৷ না পেলে যাব না৷ আমি বললাম, মা, তুমি কী চেয়েছ? বিপাশা বলল, আলস্নাহর কাছে আমি এক হাজার বসত্মা টাকা চেয়েছি৷ এই টাকা না পাওয়া পর্যনত্ম এখান থেকে আমি যাব না৷ করবস্থানের পাশে রেলিংটা ধরে সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো৷ আমি ও তার মা তাকে নিয়ে টানাটানি করতে লাগলাম৷ না, সে এ জায়গা ছেড়ে নড়বে না৷ এদিকে বাংলাভাষাভাষী কিছু লোক ছিল, তারা খুবই মজা পেয়ে গেল৷ একটি মেয়ে এক হাজার বসত্মা টাকা আলস্নাহর কাছে চাইছে, না পাওয়া পর্যনত্ম সে যাবে না- এটা তো মজার বিষয়ই৷ তখন বিপাশাকে বোঝালাম যে, এখন টাকাটা পেলে বরং সমস্যা হবে৷ এতগুলো টাকা দেশে নিয়ে যেতে হবে৷ কান্নাকাটি না করে চলো দেশে যাই৷ দেশে গেলে টাকাটা পেয়ে যাবে৷ অবশ্যই পাবে৷ আমরা দেশে ফিরে এলাম৷ আসার পর পরই জলের মতো হুহু করে টাকা আসতে লাগল৷ কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে লেখালেখি করে বিপুল অর্থ উপার্জন আপনি কীভাবে করলেন? আমি বলি, আমার ছোট মেয়ে বিপাশার কারণে করেছি- এখানে আমার কোনো হাত নেই৷

মিলন: আপনি তো বহু বিষয়ে ইন্টারেস্টেড৷ এর মধ্যে আপনার একটি খুব প্রিয় বিষয় হচ্ছে ভূত এবং বহু স্মরণীয় ভূতের গল্প লিখেছেন আপনি৷ আপনার ছোট ছোট অনেক অভিজ্ঞতার কথা জানি আমরা৷ এই ভূত ব্যাপারটা নিয়ে আপনার বিশ্বাসটা কি?

হুমায়ূন আহমেদ: বিশ্বাসটা হলো- আমি মনে করি না ভূত বলে কিছু আছে৷ ভূত না থাকলেও ভূতের ভয় আছে৷ ভূতের ভয় আছে বলেই ভূতের গল্প আছে৷

মিলন: তাহলে কী বলব? আপনি বানিয়ে বানিয়ে লিখেন?

হুমায়ূন আহমেদ: গল্প-উপন্যাস মানেই কি বানানো বিষয় না ? গল্প-উপন্যাস তো ইতিহাস না৷ তারপরেও কিছু কিছু ব্যাপার ঘটেও যায়৷

মিলন: আপনি লেখালেখির শুরম্নর দিকে কবিতা লিখেছেন, আপনার বোনের নামে সেগুলো ছাপা হয়েছে এবং হুমায়ূন আহমেদ নামেও একটি কবিতার কার্ড ছাপা হয়েছে৷ তাতে কি আপনার কবিতার প্রতি তীব্র টান প্রকাশিত হয় না?

হুমায়ূন আহমেদ: আমি একটি উপন্যাস লিখেছি৷ নাম ‘কবি’৷ তারাশঙ্করও এই নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন- বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে এটি একটি৷ সেইখানে আমার মতো একজন লেখকের আরেকজন কবিকে নিয়ে উপন্যাস লেখার ব্যাপারটি কি দুঃসাহসিক নয়? তারাশঙ্করের কবি ছিলেন সেই সময়ের কবি, আর আমার কবি হচ্ছে আজকের কবি৷ তাদের জীবনবোধ, জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে৷ তারাশঙ্করের কবি ছিল অতিদরিদ্র, আমার কবিও অতিদরিদ্র৷ দু’জনের মধ্যেই কাব্য প্রতিভা আছে৷ এই জিনিসটাকে নিয়েই লেখালেখির চেষ্টা করেছিলাম আর কি৷ তো এই উপন্যাসের জন্যেই কবিতার দরকার পড়ল৷ কাকে বলবো? ভাবলাম আমিই লিখি৷ একইভাবে আমার একটি টিভি সিরিয়ালে গ্রাম্য গায়কের কিছু গানের দরকার ছিল৷ নাটকের গান তো, সিকোয়েন্স অনুযায়ী লিখতে হয়, কাকে দিয়ে গান লেখাবো? নিজেই লিখলাম৷ দায়ে পড়ে আর কি! আমি হলাম দায়ে পড়ে কবি, দায়ে পড়ে গীতিকার৷

মিলন: ‘কবি’ উপন্যাসে যে টুকরো টুকরো কবিতার লাইন ব্যবহার করেছেন বা আপনার প্রথম উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এ যে কবিতার লাইনগুলো রয়েছে- ‘দিতে পারো একশ’ ফানুস এনে/ আজন্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে ফানুস ওড়াই৷’ এটা একজন কবির লেখা কবিতা- তা আপনি যতই ঠাট্টা-তামাশা করম্নন না কেন! কবিতার ছন্দ, শব্দের ব্যবহার এসব নিয়েও আপনি অনেক ভেবেছেন৷ এ ব্যাপারে আপনার ব্যাখ্যা কী?

হুমায়ূন আহমেদ: না, আমি কোনো ব্যাখ্যায় যেতে চাচ্ছি না৷ আমি নিজেকে একজন গল্পকার মনে করি এবং গল্পকার পরিচয়েই আমি অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি৷ কবিতাকে বলা হয় সাহিত্যের ফাইনেস্ট ফর্ম৷ এই ফাইনেস্ট ফর্মে কাজ করার ৰমতা আমার নেই৷ গদ্যটা হয়তো খানিকটা লিখতে পারি৷ কবিতা নিয়ে মাঝে মাঝে একটু চেষ্টা চলতে পারে, তাই বলে নিজেকে কখনোই আমি কবি বলি না৷ সেই প্রতিভাও আমার নেই৷

মিলন: স্বাধীনতাউত্তর সময়ে এদেশের সাহিত্যের দুটি শাখা খুবই ডেভেলপড্- কবিতা ও মঞ্চনাটক৷ এদেশের কবিদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

হুমায়ূন আহমেদ: বাংলাদেশের সাহিত্যে যারা কবিতা লিখছেন- আগে যারা লিখেছেন, এখন যারা লিখছেন- তাদের কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে আমার কোনো সংশয় নেই৷ বাংলাদেশ কবির দেশ৷

মিলন: দু’চারজন পছন্দের কবির কথা কি বলবেন?

হুমায়ূন আহমেদ: আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে অনেকেই আছেন- শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ আছেন৷ এছাড়া রয়েছেন আল মাহমুদ- এখন তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কবিতাকে কতখানি ৰতিগ্রসত্ম করেছে, সেই প্রসঙ্গে আমি যাচ্ছি না৷

ইমদাদুল হক মিলন: সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

হুমায়ূন আহমেদ: কবিতার চেয়ে তাঁর গদ্য আমার বেশি পছন্দ, তার পরেও তিনি যে কবি সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই৷

মিলন: আপাতদৃষ্টিতে আপনি একজন গম্ভীর মানুষ৷ আপনার সঙ্গে কিছুৰণ মেশার পর বোঝা যায়, আপনি অসম্ভব একজন ঠাট্টা প্রিয় মানুষ৷ আপনি ঠাট্টা করেন, মজা করেন, চমত্‍কার গল্প বলতে পারেন৷ এই গুণগুলি কি আপনার ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়েছিল?

হুমায়ূন আহমেদ: আমাদের ভাই-বোনদের প্রত্যেকেই খুবই গল্পবাজ৷ আমার মাও গল্প করতে খুবই পছন্দ করেন৷ আমার বাবাও গল্প-গুজব করতে পছন্দ করতেন৷ ব্যাপারটা হয়তোবা জিনের মাধ্যমে এসেছে, জেনেটিক্যালি এসেছে৷ আর গম্ভীর টাইপের মানুষ যেটা বলেছো, আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছি, ২০ বা ২১ বছরের মতো, অধ্যাপকদের মুখে তো সবসময় একটা আলাদা ভাব তৈরি করে রাখতে হয়৷ কিছুৰণের মধ্যেই সেই চামড়াটা ফেলে দিয়ে অরিজিন্যাল হুমায়ূন আহমেদ যখন বেরিয়ে আসে, তখন মনে হয় লোকটা খারাপ না৷

মিলন: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন কতদিন? ঐ সময় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? শিৰক হিসেবে আপনি কেমন জনপ্রিয় ছিলেন?

হুমায়ূন আহমেদ: আমি অধ্যাপনা করেছি প্রায় কুড়ি বছরের মতো৷ আমি জনপ্রিয় ছিলাম কি না, এটা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল৷ আমার কোনো ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেলে ওদেরকে জিজ্ঞেস করলে ওরা হয়তো বলতে পারত৷ আসলে হয়েছিল কী, আমি শেষের দিকে এমন একটা সাবজেক্ট পড়াতাম যেটা ছিল খুবই জটিল৷ সাবজেক্টটা হচ্ছে, কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি৷ যে সমসত্ম শিৰক এই সাবজেক্ট পড়ান তারা ছাত্রদের কাছে খুব দ্রম্নত আন-পপুলার হয়ে যান৷ কারণ এ ধরনের সাবজেক্ট খুব অ্যাবস্ট্রাক্ট৷ সাবজেক্ট অ্যাবস্ট্রাক্ট হওয়ায় কোনো ধরনের মেন্টাল ছবি দাঁড় করানো যায় না৷ অংকের সাহায্যে জিনিসটা বুঝতে হয়৷ আর এমনিতেই তো আমাদের কেমিস্ট্রির ছাত্রদের মেথমেটিক্স জ্ঞানটা একটু কম থাকে অর্থাত্‍ সেইভাবে জোরালো জ্ঞান মেথমেটিক্সের ওপর থাকে না৷ বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই বুঝতে পারে না, কী পড়ানো হচ্ছে৷ যখন বুঝতে পারে না তখন সাবজেক্টটার ওপর একটা বিতৃষ্ণা তৈরি হয়৷ যিনি পড়াচ্ছেন তার প্রতিও বিতৃষ্ণা তৈরি হয়৷ এই জিনিসটা আমার ৰেত্রে ঘটেছে কিনা আমি বলতে পারব না৷ আমি খুবই চেষ্টা করেছি, যতটা সম্ভব সহজভাবে এই অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিসটি বোঝানোর৷ আমার কাছে মনে হয়, হয়তোবা পেরেছি৷ আমার দিক থেকে এই জটিল বিষয় তাদের বুঝানোর চেষ্টায় খাদ ছিল না৷ আমি যখন দেখলাম কোয়ান্টাম মেথড ওরা বুঝতে পারছে না, আমি তখন এই বিষয়ে একটি বই লিখে ফেললাম বাংলায়৷ আমি এই বইয়ে যতটা পারি সহজভাবে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছি৷ মিলন: আমার মনে আছে, এই বই বেরিয়েছিল কাকলী প্রকাশনী থেকে৷ ওরকম বই বাংলা ভাষায় আপনার আগে কেউ লিখে নি, এই তথ্যটা কি আপনি জানেন?

হুমায়ূন আহমেদ: আমি সেটা জানি না৷ অতি জটিল একটা বিষয় নিয়ে বাংলায় মজা করে লেখার চেষ্টা করেছি৷ অনেকেই সায়েন্সফিকশন মনে করে এই বই কিনে নিয়ে ধরা খেয়েছে৷

মিলন: এই বইটি কি আপনার ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে সেইভাবে পপুলার হয়েছিল?

হুমায়ূন আহমেদ : আমি যতদিন ক্লাস নিয়েছি ততদিন তারা এই বইটি পড়েছে৷

মিলন: আপনি এমন একটি দুরূহ বিষয়ের টিচার হবার পরও এত জনপ্রিয় একজন লেখক হয়ে গেলেন, এই বিষয়ে আপনার ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ বা প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

হুমায়ূন আহমেদ: আমার প্রতি আগ্রহ তাদের বেশ ভালোই ছিল৷ রসায়ন অনার্স ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী কম, হঠাত্‍ দেখি আমার ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী বেশি বেশি লাগছে৷ ছাত্রসংখ্যা বড় জোর ৩০ হলেও, দেখা যেত উপস্থিত আছে ৪২/৪৩ জন৷ দেখা গেল, এরা কেমিস্ট্রির ছাত্র না৷ কেউ জিওগ্রাফির, কেউ সয়েল সায়েন্সের, আবার দেখা গেল কেউ কেউ এসেছে আর্টস ফ্যাকাল্টি থেকে৷ ওরা এসেছে জাস্ট দেখার জন্য, এই লেখক মানুষটি কীভাবে ক্লাস নেয়৷ এটি যখন মোটামুটি জানাজানি হয়ে গেল তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে বলা হলো, আমি যেন আমার ক্লাসে বাইরের কাউকে এলাউ না করি৷ কাজেই পরবর্তীতে ক্লাস নেবার শুরম্নতে দেখে নিতে হতো, ক্লাসের ছাত্র কারা আর ক্লাসের বাইরের ছাত্র কারা৷

মিলন: ছোটদের জন্য লেখালেখি নিয়ে আপনার ভাবনা কী? প্রথম ছোটদের জন্য কবে থেকে লেখা শুরম্ন করেন?

হুমায়ূন আহমেদ: প্রথম লেখাটা বোধহয় ‘নীল হাতি’৷ কবে বের হয়েছিল সেটা ঠিকঠাক বলতে পারব না৷ অবজারভার গ্রম্নপ বাচ্চাদের জন্য একটা পত্রিকা বের করেছিল৷ পত্রিকাটির নাম বোধহয় ‘কিশোর বাংলা’৷ ওটার প্রথম সংখ্যার জন্য লেখাটা দিলাম৷ ভয়ে ভয়ে ছিলাম, বাচ্চাদের জন্য প্রথম লেখা তোঃ কেমন হয় ? ওটাই আমার প্রথম লেখা বাচ্চাদের জন্য৷ তারপর আমার নিজের বাচ্চারা যখন বড় হলো, তখন ওদের পড়ার জন্য ওদের উপযোগী করে বেশ ক’টি লেখা দাঁড় করাই৷ ওগুলোতে বেশিরভাগ চরিত্রগুলোর নাম ওদের নামেই- নোভা, শীলা, বিপাশা, নুহাশ৷ একটা সময় বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রচুর বাচ্চাদের বই লিখি৷ বাচ্চারা কিন্তু কঠিন পাঠক৷ বাচ্চাদের মা-বাবা আমাকে ধমক দিতে ভয় পায়৷ কিন্তু বাচ্চারা পায় না৷ তারা ধমক দিয়ে আমাকে বলে, কী ব্যাপার, নতুন বই কই? বই নাই কেন? তখন আমি খুব আনন্দ পাই৷ আমি তখন তাদের বলি, আগামী বইমেলায় তোমাদের জন্য নতুন একটা বই থাকবে৷ ওদের মুখের দিকে তাকিয়েই আমাকে কথা রাখতে হয়৷

মিলন: আপনারা তিনভাই তিনবোন৷ আপনার এক ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন বড় মাপের লেখক৷ আরেক ভাই আহসান হাবীব কার্টুন এঁকে রম্য লিখে বিখ্যাত হয়েছেন৷ একই পরিবারের তিনজন মানুষ তিনরকমভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন৷ এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?

হুমায়ূন আহমেদ: এরা প্রত্যেকেই নিজ যোগ্যতায় আজকের পর্যায়ে পেঁৗছেছে, নিজস্বভাবেই তারা প্রতিষ্ঠিত৷ এরা প্রত্যেকে আলাদা মানুষ৷ সাধারণভাবে একই পরিবারে দুই-তিনজন লেখক তৈরি হলে একজনের ছাপ অন্যজনের ওপর পড়ে৷ এটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু আমার ভাইদের মধ্যে ছাপের কোনো ব্যাপার নাই৷ জাফর ইকবাল লিখছে একেবারে তার নিজস্ব স্টাইলে৷ আমার লেখার কোনো ছাপ তার মধ্যে নাই৷ আহসান হাবীব লিখছে সম্পূর্ণ তার মতো করে৷ ছবি-টবি অাঁকছে তার নিজস্ব চিনত্মা থেকে৷ বড় দুই ভাইয়ের কোনো ছাপ তার মধ্যে নাই৷ প্রত্যেকেই প্রত্যেকের আলাদা জায়গায় কাজ শুরম্ন করেছে এবং ভালো কাজ করছে৷ আমরা ভাইবোনেরা ইনক্লডিং মাই সিস্টার্স, যারা লেখালেখির লাইনে আসে নাই- এরা প্রত্যেকেই যে কাজটি করে খুব সিনসিয়ারলি করে৷ এটা আমাদের পারিবারিক গুণ বলা যেতে পারে৷ আমরা ভাইবোনেরা কোনো কাজ হাতে নিলে সেটা ঠিকভাবে করব, এটা স্বতঃসিদ্ধ৷

মিলন: বাংলা ভাষায় আপনার প্রিয় লেখক কারা কারা ? যাদের লেখা আপনি সবই প্রায় পড়েছেন ?

হুমায়ূন আহমেদ: একদম শুরম্ন থেকে বলি৷ বঙ্কিমচন্দ্র৷ কেননা তাঁর গল্প তৈরির ৰমতা অসাধারণ৷ তারপর আমাদের শরত্‍চন্দ্র৷

মিলন: একটি ভিন্ন বিষয়ে আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই৷ বিষয়টি হলো ‘মৃতু্য-চিনত্মা’৷ আমি জানি যে, আপনি মৃতু্য নিয়ে ভাবেন৷ জাগতিক বিষয়ের পাশাপাশি মৃতু্য-পরবর্তী জগত্‍ নিয়েও আপনি ভাবেন৷ আপনার মৃতু্য-চিনত্মাটা কী রকম?

হুমায়ূন আহমেদ: আমি থাকব না, এই পৃথিবী পৃথিবীর মতো থাকবে৷ বর্ষা আসবে, জোছনা হবে৷ কিন্তু সেই বর্ষা দেখার জন্য আমি থাকব না৷ জোছনা দেখার জন্য আমি থাকব না৷ এই জিনিসটি আমি মোটেও নিতে পারি না৷ আগেও কখনো পারতাম না, এখনো যতই ঐদিকে এগিয়ে যাচ্ছি ততই আর পারছি না৷

মিলন: বড় লেখকদের ৰেত্রে কালজয়ী শব্দটা বাংলা ভাষায় আছে৷ যারা সময়কে জয় করে নেন নিজের লেখার মধ্য দিয়ে৷ আপনি আপনার লেখার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন, এই ফিলিংসটা আপনার কেমন?

হুমায়ূন আহমেদ: এই বিষয়টা একেবারেই আমার মাথায় আসে না৷ আমিই নেই আর আমার লেখা লোকজন পাঠ করছে, এতে আমার কী যায় আসে?

মিলন: কিন্তু এরকম কি কখনো মনে হয় না, আমার যে লেখাগুলো আমি রেখে যাচ্ছি, তার মধ্যেই আমি বেঁচে থাকব, লোকজন আমাকে স্মরণ করবে?

হুমায়ূন আহমেদ: না, সেরকম মনে হয় না৷ মিলন, আমি তোমাকে সিরিয়াসলি বলছি, আই অ্যাম টেলিং ইউ ফ্রম মাই হার্টঃ এই চিনত্মাটা কখনো আমার হয় না যে, ৫০ বছর পর লোকে আমার লেখা পড়বে, আমি কত ভাগ্যবান! আমি সারাজীবন লেখালেখি করেছি নিজের আনন্দের জন্যে৷

মিলন: আপনি বললেন যে, বেশ কয়েকবার মৃতু্য খুব কাছ থেকে দেখেছেন৷ যখন আপনার বাইপাস সার্জারিটা হলো, যখন আপনাকে এনেসথেশিয়া দেয়া হচ্ছে, আপনার সেন্সটা অন্য জগতে চলে যাচ্ছে৷ এই যে ঘুমে তলিয়ে যাবার সময়টা, যতৰণ পর্যনত্ম আপনার চেতনা ছিল, সেই মুহূর্তে আপনি বিশেষ কিছু কি ভেবেছেন? আপনার মনে পড়ে?

হুমায়ূন আহমেদ: আমি তো মুসলমানের ছেলে৷ ধর্ম-বিশ্বাসটা জন্মের পর থেকেই খুব শক্তভাবে মাথায় ঢোকানো৷ সেই মুহূর্তে আমি যে ক’টা সুরা জানতাম, বারবার সেগুলোই মনে মনে পড়ার চেষ্টা করেছি এবং সুরা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে যাবার প্রার্থনা করছিলাম৷ পুত্র-কন্যা-স্ত্রী-ভাই-বোন এদের কারোর কথাই মনে হয়নি৷

মিলন: আচ্ছা হুমায়ূন ভাই, বাংলাদেশ নিয়ে আপনি কী ধরনের স্বপ্ন দেখেন? এই দেশের স্বাধীনতার জন্য একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, এই মুক্তিযুদ্ধে আপনার বাবা প্রাণ দিয়েছিলেন৷ বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এই দেশের আজকের প্রেৰাপটে আপনি অনেক বড় লেখক৷ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনি বাংলাদেশ নিয়ে কী স্বপ্ন দেখছেন?

হুমায়ূন আহমেদ: আমি আমার নিজের দেশ নিয়ে অসম্ভব রকম আশাবাদী৷ আমাকে যদি একলৰবার জন্মাবার সুযোগ দেয়া হয় আমি একলৰবার এই দেশেই জন্মাতে চাইব৷ এই দেশের বৃষ্টিতে ভিজতে চাইব৷ এই দেশের বাঁশবাগানে জোছনা দেখতে চাইব৷

http://www.ittefaq.com/content/2008/11/07/news0649.htm