অসত্মিত্ব সংকটের চিত্র ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ও ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’

মাহমুদুল বাসার
উপন্যাসে অসত্মিত্ববাদী দর্শন প্রয়োগ একটি আধুনিক, মননশীল মাত্রা সংযোজনের পর্যায়ভুক্ত৷ সর্ব যুগেই কিন্তু মানুষের মন সবচেয়ে বিচিত্র ও জটিল৷ তবে আধুনিকতা ক্রমান্বয়ে যত তীৰ্ন হয়েছে, ততই মানুষের মন জটিল হয়েছে, ততই মানুষের অসত্মিত্বে সংকট দেখা দিয়েছে৷ অসত্মিত্বের সংকট এড়িয়ে আধুনিকতার কথা কল্পনা করা যায় না৷ ‘মত্‍স ধরিব, খাইব সুখে’_ এমন সমাজ ও এমন জীবনে যেমন আধুনিকতা নেই, তেমন অসত্মিত্ব-সংকটও নেই৷
প্যারিচাঁদ মিত্রের চেয়ে বঙ্কিমচন্দ্র ততটাই আধুনিক, যতটা তিনি রূপমুগ্ধ নরনারীর অসত্মিত্ব-সংকটের অন্বেষণ করেছিলেন৷ বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ ততটাই সূক্ষ্ম, আধুনিক, যতটা তিনি গল্প-উপন্যাসে মানব-মানবীর গূঢ় অসত্মিত্ব পর্যবেৰণ করেছেন৷ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ ততটাই আধুনিক, তাঁরা যতটা মানব-মানবীর মনোবিকলন অনুসন্ধান করেছেন, মানুষের ভেতরের অসত্মিত্ব-সংকট চিত্রায়ন করেছেন৷
ভেতরে ভেতরে মানুষ নীতির অনুশাসন ছিঁড়ে ফেলে মানবিক চাহিদা পূরণের দিকে অগ্রসর হয়, তখন নিজের ভেতরই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, হৃদয় জর্জরিত হয়, রক্তাক্ত হয়৷ এই রক্তাক্ত দ্বন্দ্বের অনত্মর্গত চেহারা আমরা সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসের মজিদ চরিত্রে দেখেছি৷ এটা এক দিক৷
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যনত্ম বিখ্যাত গল্প ‘প্রাগৈতিহাসিক’৷ সে গল্পের নায়ক ভিখু৷ তাকে দেখি, সে প্রবলভাবে অসত্মিত্ববাদী৷ হার মানে না কোথাও৷ চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি করে হোক বা রাসত্মায় বসে ভিৰা করে হোক সে তার অসত্মিত্ব-সংকটের লড়াইয়ে বিজয়ী হবেই হবে৷ গল্পকার বলছেন, ”মরিবে না৷ সে কিছুতেই মরিবে না৷ বনের পশু যে অবস্থায় বাঁচে সেই অবস্থায়, মানুষ সে বাঁচিবেই৷”
অসত্মিত্বের লড়াইয়ে প্রতিটি মানুষ বাঁচতে চায়৷ দুর্বল স্বভাবের মানুষেরা বাঁচতে পারে না৷ আমরা এই আলোকে বাংলাদেশের দু’জন বিখ্যাত কথাশিল্পীর দু’টি বিখ্যাত উপন্যাস আলোচনার দায়িত্ব নিয়েছি : সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহর ‘চাঁদের অমাবস্যা’ এবং সেলিনা হোসেনের ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’৷
‘চাঁদের অমাবস্যা’ সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহর দ্বিতীয় উপন্যাস৷ প্রকাশ পেয়েছিল ঢাকা থেকে ষাটের দশকে৷ সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ বিশ্বমানের আধুনিক কথাশিল্পী৷ পূর্ব বাংলার কথাসাহিত্যকে তিনি বিশ্বমানসম্পন্ন আধুনিকতায় রূপ দেন৷ জীবনানন্দ দাশ কবিতায় পূর্ব বাংলার ঐতিহ্যকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যান৷ জীবনানন্দ দাশের কবিতায় এবং তার ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে যে অকথ্য, বেদনাদীর্ণ অসত্মিত্ব-সংকট আছে, তেমনি চলিস্নশের কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহর মধ্যেই অসত্মিত্ব-সংকটের লড়াই আছে৷ ষাটের দশকে আইয়ুব খান পাকিসত্মানের দোর্দ- প্রতাপশালী শাসক৷ পূর্ব বাংলায় বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন লৌহ নির্মিত কঠিন শাসন৷ পূর্ব বাংলাকে অবরম্নদ্ধ কলোনিতে পরিণত করেছিলেন৷ কলোনির মানুষ কখনো মেরম্নদ-শীল মানুষ হয় না৷
তাদের মেরম্নদ-ে সাপের বিষের মতো অনুপ্রবেশ করে ভীতি৷ ভীতসন্ত্রসত্ম মানুষ কোদালকে কোদাল বলতে পারে না৷ অথচ তার মধ্যেও থাকতে পারে বিবেক, পাপবোধ, মানবপ্রেম, গণতান্ত্রিক চেতনা, জৈবিক তাড়না৷ মুক্ত পরিবেশের অভাবে ওই কল্যাণপ্রসূ বোধ বিকশিত হয় না৷ আবুল ফজল বলেছেন, ”খাঁচার বাঘ কখনো খাঁটি বাঘ হয় না৷” (রেখাচিত্র)৷ এখানেই সংকট বাধে অসত্মিত্বে৷
সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসে পূর্ব বাংলার অবরম্নদ্ধ শৃঙ্খলিত সমাজের ভেতরগত গূঢ় চিত্র অঙ্কন করেছেন৷ স্বৈরাচার পিষ্ট সমাজের মানুষের মনোবৈকলিক সংকটের চেহারা উন্মোচন করেছেন, যাকে অসত্মিত্বের সংকট বলে চিনতে পারি৷
‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসের নায়ক একজন স্কুলশিৰক৷ নাম আরেফ আলী৷ ঔপন্যাসিক তাকে যুবক শিৰক বলে বারবার অভিহিত করেছেন৷
যুবক শিৰক অতিশয় দরিদ্র৷ চাঁদপারা গ্রামে তার বাড়ি৷ হাতের তালুর মতো একটু জায়গা-জমি আছে তাদের৷ বিধবা মা সংসারে৷ আর কেউ নেই৷ শাক-সবজির জমিটুকু বিক্রি করে উচ্চশিৰার অভিলাষ পূরণ করা তার পৰে সম্ভব হয়নি৷
তাই সদ্য প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলে সে চাকরি নিয়েছে৷ স্কুলটি গ্রামে৷ এ গ্রামের জোতদার বড় দরবেশ সাহেব স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন৷ এ বড় বাড়িতেই লজিং মাস্টার হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে যুবক শিৰক৷
যুবক শিৰকের কোনো খরচ নেই, কেননা আশ্রয়দাতাদের বাড়িতে খায়, থাকে৷ বেতন যা পায়, তা পাঠিয়ে দেয় বিধবা মাকে৷
এক গভীর পূর্ণিমা রাতে যুবক মাস্টার বড় বাড়ি সংলগ্ন জঙ্গলের মতো ঘরের পেছনে এক ঝোঁপের পাশে একটি জাম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে৷ সে বাইরে এসেছিল প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য৷ হঠাত্‍ দেখতে পায় বড় বাড়ির দাদা সাহেবের ছোট ভাই কাদের দরবেশ হেঁটে যাচ্ছে একা একা ভরা জোছনার ভেতর দিয়ে৷ যুবক মাস্টার কৌতূহলী হয়ে ওঠে৷ সে কাদেরকে অনুসরণ করতে থাকে৷ দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় যুবক মাস্টারকে৷ রাতের জোছনা ভরা, রূপালি চাঁদের ঢেউ খেলানো প্রকৃতি_ চষা ৰেত, গৃহসত্মের বসতবাড়ি, ভিটেবাড়ি পেরিয়ে কাদের দরবেশ নদীর পাড়ে এক গভীর বাঁশবনের ভেতর চলে যায়৷ এর মধ্যে যুবক মাস্টার কাদেরের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে তাকে হারিয়ে ফেলে৷ একটা অনতিদীর্ঘ সময় পর সেও হাজির হয় ওই বাঁশবনে৷ দেখতে পায় এক বীভত্‍স দৃশ্য : ‘শীতের উজ্জ্বল জ্যোত্‍স্না রাত, তখনো কুয়াশা নামে নাই৷ বাঁশঝাড়ে তাই অন্ধকারটা তেমন জমজমাট নয়৷ সেখানে আলো-অন্ধকারের মধ্যে যুবক শিৰক একটি যুবতী নারীর অর্ধ উলঙ্গ মৃতদেহ দেখতে পায়৷ … পায়ের ওপর একঝলক চাঁদের আলো৷” (চাঁদের অমাবস্যা-পরিচ্ছেদ এক)৷
এই পাশবিক দৃশ্য দেখে তার মতো যুবক শিৰকের তাবত্‍ অসত্মিত্বের মধ্যে প্রলয়কা- শুরম্ন হয়ে যায়৷ সে হতভম্ভ, বিভ্রানত্ম, বিমূঢ় ও বিপণ্ন দশায় উপনীত হয়৷ তার অসত্মিত্বের মধ্যে মারাত্মক সংকট দেখা দেয়৷ সে একটা মরণাপন্ন মুমূষর্ু দশায় উপনীত হয়৷ তার শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে৷ সে চষা ৰেত বরাবর রম্নদ্ধশ্বাসে দেঁৗড়াতে থাকে৷ এক পর্যায়ে সে ৰেতের আইলের পাশে উবু হয়ে পড়ে থাকে৷ তার ভেতর থেকে চিরতরে প্রশানত্মি শিশিরের মতো উবে যায়৷ কত কষ্টে পড়ালেখা শিখেছিল, স্কুলে চাকরি পেয়ে তার দারিদ্র্য বিমোচন ঘটেছিল, আশ্রয় পেয়েছিল এই বড় বাড়িতে৷ এরা জোতদার-ভূস্বামী, এরাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা৷ বেতন পেলে বিধবা মাকে পাঠিয়ে দিত৷ অথচ এ বাড়িরই প্রভাবশালী ব্যক্তি কাদের দরবেশ এই পাশবিক ব্যভিচারের সঙ্গে জড়িত৷
যুবক শিৰকের মতো গ্রাম্য-দরিদ্র-নিরীহ মানুষ এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়নি৷ বলা হচ্ছে, ”সাপের মুখগহ্বরে ঢুকে ব্যাঙের আওয়াজ যেন হঠাত্‍ থামে বা মসত্মক দেহচু্যত হলে মুখের আওয়াজ যেন অকস্মাত্‍ সত্মব্ধ হয়৷ দেহচু্যত মাথা এখনো হয়তো আর্তনাদ করছে, কিন্তু তাতে আর শব্দ নাই৷”
অমানবিক উদাহরণ৷ সাপের গ্রাসের সামনে ব্যাঙ যেমন অসহায়, তেমনি ব্যাঙের মতো অসহায়-দরিদ্র, গ্রামের এক মাঝির বন্ধ্যা যুবতী স্ত্রীকে বাঁশঝাড়ে ডেকে এনে কাদের দরবেশ বলাত্‍কার করে৷ কৌতূহলবশত যুবক শিৰক ওখানে উপস্থিত হলে শুকনো বাঁশ পাতার মচমচ শব্দ শুনে বন্ধ্যা বউটি ভয়ে দাপাদাপি করেছিল, হয়তো চিত্‍কার দিতে চেয়েছিল, হয়তো নিজেকে কাদেরের লোমশ হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল৷ তার কণ্ঠকে সত্মব্ধ করার জন্য কাদের শায়িত নারীর গলদেশ চেপে ধরেছিল, তাতে তার মৃতু্য ঘটে৷ অর্ধ বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকে৷ কাদের বাঁশঝাড় থেকে দ্রম্নত বের হয়ে যায়৷
এখানে কাদের যে বন্ধ্যা বউটিকে ভোগ করার জন্য ডেকে এনেছিল, হয়তো সে স্বেচ্ছায়ই এসেছিল৷ গরিব, এত বড় প্রভাবশালী বড় বাড়ির মানুষের আহ্বান উপেৰা করতে পারেনি৷ মানুষের পদশব্দ শ্রবণ করে বিচলিত হয় কাদের৷ কেউ জেনে ফেললে বড় বাড়ির ইজ্জত যাবে৷ তাই বউটির গলা চেপে ধরেছিল, যাতে শব্দ না করে৷ যাতে কেউ না জানে৷ জীবনের চেয়ে ঠুনকো ইজ্জত এখানে বড় হয়ে দেখা দেয়৷ বিবেক, মনুষ্যত্ব লাঞ্ছিত হয়৷
এরই নিদারম্নণ প্রতিক্রিয়া হয় যুবক শিৰকের বিবেকের মধ্যে৷ সবচেয়ে মর্মানত্মিক হচ্ছে, তার মধ্যে কাজ করতে থাকে প্রতিকারহীন প্রতিক্রিয়া৷ এটাই অসত্মিত্বের সংকট৷
রাজা ইডিপাস তো জানতেন না যে সে তার বাবাকে হত্যা করবে৷ নিজেরই বিধবা মা জোব্দা স্টাকে বিয়ে করবেন৷ কিন্তু নিয়তির চক্রে এমনই ঘটে গেছে৷ প্রজাদরদি, সত্যসন্ধানী, বিবেকবান রাজা রাষ্ট্র থেকে পাপ বিদূরিত করার জন্য সঠিক ঘটনার আবরণ উন্মোচনে তত্‍পর৷ থামবেন না তিনি৷ জানালেন লোমহর্ষক হৃদয়বিদারক ঘটনা৷ শুরম্ন হলো দিকচক্রবালব্যাপী মানসিক সংকট৷ যাকে বলে অসত্মিত্বের সংকট৷
‘চাঁদের অমাবস্যা’তেও দেখি, অপাপবিদ্ধ যুবক শিৰক জানতে পারল, এমন হৃদয়হীন ব্যভিচার কাদের দরবেশই ঘটিয়েছে৷ কিন্তু খুব সহজে কাদেরের ওপর থেকে প্রচলিত ধারণা সরাতে পারছে না৷ সে এমন কাজ করতে পারে,